September 1, 2026, 6:17 am
শিরোনাম:
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা শুরু নেত্রকোনায় ৫০ কোটি টাকার শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এখন তালাবদ্ধ নন্দীগ্রামে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কমিটিতে সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসাবে জাহিদুল ইসলাম কুমিল্লার চান্দিনায় কাকী হত্যা: স্বামী-স্ত্রীর যাবজ্জীবন নওগাঁ মান্দার পাকুড়িয়া ১৯৭১ সালের গণহত্যার ৫৫ বছর, পাকুড়িয়ায় ১২৮ জন শহীদের স্মরণে আজ শ্রদ্ধাঞ্জলি সৌদি-সোফা কারখানায় আগুনে পুড়ে নিহত ৭ প্রবাসীর জানাজা হলো নওগাঁয় গোবিন্দগঞ্জে রাজাহার ইউনিয়নের নিচকিন চাপড় গ্রামে শিশু-কিশোরদের মাঝে ফুটবল বিতরণ লুলাইং সড়কে চলমান কাজ বন্ধ থাকায় চরম জনদুর্ভোগ সাধারন মানুষ, তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত উখিয়ায় লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবার ২৯৬তম শুভ আবির্ভাব উৎসব উপলক্ষে ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন

নেত্রকোনায় ৫০ কোটি টাকার শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এখন তালাবদ্ধ

রিপোর্টারের নাম

নেত্রকোনায় ৫০ কোটি টাকার শৈলজারঞ্জন মজুমদারের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এখন তালাবদ্ধ

সোহেল খান দূর্জয়-নেত্রকোনা : নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জন্মভিটায় নির্মিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি গত দুই বছর ধরে কার্যত অচল। বেড়ার ওপারে মৌসুমি ফুলে রঙের স্বপ্ন বোনা, চেয়ে দেখে দেখে জানালার নাম রেখেছি নেত্রকোনা। শ্যামলী কাব্যগ্রন্থে উৎসর্গ কবিতায় নেত্রকোনার কথা এভাবেই লিখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ তিনি কোনোদিন নেত্রকোনায় আসেননি। এই জনপদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়েছিল রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের মাধ্যমে। সেই শৈলজারঞ্জনের জন্মভিটায় তিন বছর আগে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কেন্দ্রটিতে লুটপাট চালানো হয়। শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌর কার্যালয় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বাহাম গ্রামে। সেখানে সোয়া দুই একর জমির ওপর কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। গত দুই বছর এই কেন্দ্রে কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়নি। এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা উদীচীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান শুধু ভবন, যাদুঘর কিংবা মিলনায়তন দিয়ে জীবন্ত হয় না। নিয়মিত অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, শিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং দর্শনার্থীদের আনাগোনার মধ্যে দিয়েই একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রাণ পায়। শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে এখন সেই প্রাণেরই অভাব।

এ বিষয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে,গত ২৫ আগস্ট বেলা ১১ টার দিকে কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক বন্ধ। পরে মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এর কিছুক্ষণ পর মোহাম্মদ সামিউজ্জামান নামের এক ব্যক্তি এসে ফটকের তালা খুলে দেন। কথা বলে জানা যায়, তিনি কেন্দ্রটির টেকনিশিয়ান। বর্তমানে কেন্দ্রটির সার্বিক দায়িত্ব তাকেই সামলাতে হচ্ছে। কেন্দ্রে প্রবেশ করে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় পরিচর্যা না করায় ঘাস লতাপাতায় ঢেকে গেছে। ভবনের ভেতরে গ্রন্থাগার ও মহড়া কক্ষের ছাদের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। মিলনায়তনের অনেক সরঞ্জাম নেই। লিফট ও অকেজো। বিভিন্ন কক্ষে ৫টি এসি অকার্যকর, অন্তত ৫৩টি বাতি নষ্ট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এই কেন্দ্রের বৈদ্যুতিক পাখা, চেয়ার, টেবিল, ঝাড়বাতি, বিভিন্ন ধরনের বাতি, সিসিটিভি ক্যামেরা, সাউন্ড বক্স, আইপিএস, কম্পিউটার, মনিটর, বাদ্যযন্ত্র, বজ্রনিরোধক যন্ত্র, অডিটোরিয়ামের কন্ট্রোল বক্স সহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম, লুট হয়। পরে স্হানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে সেগুলোর কিছু ফেরত আনা হয়েছে। এদিকে ভবন আছে নেই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত বিভাগ কেন্দ্রটি নির্মাণ করে। পরে ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় ধরা হয় পাঁচ কোটি টাকা। এর বাইরে সংযোগ সড়ক নির্মাণেও প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে অঙ্ক দাঁড়ায় ৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে নির্মাণ কাজ শেষে ২০২৩ সালের ১১ মার্চ কেন্দ্রটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। মূল পরিকল্পনায় ছিল, এখানে রবীন্দ্রসংগীতের প্রশিক্ষণ ও গবেষণা হবে। পাশাপাশি নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও হাওরাঞ্চলের লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা এবং উৎসব আয়োজন করা হবে। উদ্বোধনের পর সেখানে এক বছরে কয়েকটি অনুষ্ঠান হয়েছে। এবং ২৫ আগস্ট নেত্রকোনার মদন উপজেলা থেকে এই কেন্দ্র দেখতে আসা সংস্কৃতি কর্মী মোঃ সানোয়ারুজ্জামান এই প্রতিনিধিকে বলেন, এতো টাকা খরচ করে এতো সুন্দর স্থাপনা হলো। কিন্তু এখানে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। এটা খুবই দুঃখের বিষয়। এ ব্যাপারে পরিচালনা কমিটির যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে আরও জানা যায়, কার্যক্রম শুরুর পর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য ২১ সদস্যের একটি কমিটি আছে। পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক কমিটির সভাপতি। মোহনগঞ্জের ইউএনও এই কেন্দ্রের সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কমিটির একজন সদস্য এই প্রতিনিধিকে বলেন, কমিটিতে আমাকে রাখা হয়েছে। কিন্তু গত তিন বছরে একটি সভা ও আহবান করা হয়নি। কেন্দ্রটির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে কমিটি, সেটির কার্যক্রমেই যদি না থাকে। তাহলে প্রতিষ্ঠানটি সচল হবে কিভাবে। কেন্দ্রটির জনবল কাঠামোতেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ইউএনও জানান, কেন্দ্রটিতে ৩৪ টি পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সামিউজ্জামান ইমন ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী জয় হরিচরণ। এই দুই কর্মীর বেতন ভাতাসহ বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খাতে মাসে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটির নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা আছে বলে জানিয়েছেন ইউএনও। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চাইলে ওই তহবিলে অর্থ দিতে পারে। কেন্দ্রে প্রবেশ ফি ২০ টাকা। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানিয়ে নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, এই কেন্দ্র কিভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ভাবা হচ্ছে। ১৯০০ সালের ১৯ জুলাই মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামে জন্ম নেওয়া শৈলজারঞ্জন মজুমদার ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের বিশিষ্ট সাধক, শিক্ষক ও স্বরলিপিকার। রবীন্দ্রনাথ তাকে গীতাম্বুধি উপাধি দিয়েছিলেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টর অব লিটারেচার উপাধি দেয়। শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জীবনীগ্রন্থের প্রণেতা সঞ্জয় সরকার বলেন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। আমাদের ধারণা ছিল, এটি সংস্কৃতি চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে। কিন্তু কতৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় এটি এক অচলায়তনে পরিনত হয়েছে। যা খুবই দুঃখজনক। আমরা চাই সরকার রাষ্ট্রের এই সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগাক। প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিয়ে এটিকে সচল করা হোক।

 

৩১/০৮/২০২৬ ইং


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page
Developed by: BD IT HOST