August 8, 2026, 5:01 am
শিরোনাম:
পীরগাছায় বাংলাদেশ বুলেটিনের ৯ম বর্ষপূর্তি উদযাপন ছাতনাই নদীতে মাছ শিকার করতে গিয়ে এক মৎস্য জীবী জেলের মৃত্যু বড়াইগ্রামে ২৭২ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার দুই মাদক কারবারি ধর্মসাগরের ভোরে সুরের জাগরণ: ব্যায়াম, প্রকৃতি আর বাংলার লোকসংগীতে মুখর প্রতিটি সকাল রামপালে স্কুল ছাত্রী ও তার বাবাকে পিটিয়ে জখম, থানায় অভিযোগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে সিংড়ার ২১০ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানা আয়োজন নেত্রকোনায় জামিনে বেরিয়েই ফের বকুলের স্পিরিট মাদক ব্যবসা: এবার কৌশল বদলে হাওরে সরবরাহ, মূল হোতাদের গ্রেপ্তারের দাবি নওগাঁর পত্নীতলা খঞ্জনপুর বিওপির মরাডাঙ্গা সীমান্তা এলাকায় ৯৪ কেজি কষ্টিপাথরের বিষ্ণু মূর্তি উদ্ধার এটাই কি ৫ই আগস্ট, শ্রমজীবী ভাইয়েরা এখনো বৈষম্যের শিকার, শ্রমিকের কান্না কেউ দেখেনা? নড়াইলের মুলিয়ায় এক পা-তেই জীবন সংসার গোপী বিশ্বাস’র প্রতিবন্ধী জীবনটাই যেন অভিশাপ

ধর্মসাগরের ভোরে সুরের জাগরণ: ব্যায়াম, প্রকৃতি আর বাংলার লোকসংগীতে মুখর প্রতিটি সকাল

রিপোর্টারের নাম

ধর্মসাগরের ভোরে সুরের জাগরণ: ব্যায়াম, প্রকৃতি আর বাংলার লোকসংগীতে মুখর প্রতিটি সকাল

কুমিল্লা প্রতিনিধি:

কুমিল্লার ঐতিহাসিক ধর্মসাগর পাড়। সূর্যের প্রথম আলো যখন শান্ত জলের বুকে সোনালি আভা ছড়িয়ে দেয়, তখনই শুরু হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক আয়োজন। এটি শুধু একটি সংগীত পরিবেশনা নয়; বরং সুস্থ জীবনচর্চা, বাংলা সংস্কৃতির চর্চা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবিক বন্ধনের এক অপূর্ব মিলনমেলা। প্রতিদিন ভোরে ধর্মসাগর পাড়ের সুপ্রভাত মঞ্চ যেন পরিণত হয় বাংলার লোকঐতিহ্যের এক প্রাণবন্ত আসরে।

ভোরের নির্মল পরিবেশে ব্যায়াম ও হাঁটা শেষে একে একে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ঠিক তখনই শুরু হয় বাংলার চিরায়ত লোকসংগীতের সুরধারা। সুপ্রভাত মঞ্চের মুখপাত্র অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী পরিবেশন করেন জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভান্ডারি এবং লালন সংগীত। তাঁর কণ্ঠে বাংলার মাটি ও মানুষের গান যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়।

এই আয়োজনে সঙ্গীতের প্রাণ আরও উজ্জ্বল করে তোলেন অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার। ঢোল ও একতারা বাজিয়ে তিনি পুরো পরিবেশকে করে তোলেন প্রাণচঞ্চল। প্রতিটি তালে-লয়ে উপস্থিত দর্শনার্থীরা যেন ফিরে যান বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতির সেই চিরচেনা আবহে।

হারমোনিয়াম ও কিবোর্ডে কণ্ঠশিল্পী ভূষণ সূত্রধর তাঁর সুরের মূর্ছনায় দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখেন। পাশাপাশি অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে অনুষ্ঠানকে আরও সমৃদ্ধ করেন সুজন চন্দ্র সরকার, অধ্যক্ষ নিখিল চন্দ্র রায়, গৌতম চন্দ্র দাশ, নেপাল চন্দ্র দাশ, অধ্যাপক অনুকূল চন্দ্র দাশ এবং প্রফেসর মৃনাল কান্তি গোস্বামীসহ আরও অনেক সংস্কৃতিপ্রেমী ব্যক্তিত্ব। তাঁদের সম্মিলিত পরিবেশনায় প্রতিদিনের সকাল হয়ে ওঠে এক টুকরো উৎসব।

ধর্মসাগরের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন কেবল উপস্থিত দর্শনার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিদিনের মনোমুগ্ধকর মুহূর্তগুলো নিজেদের ক্যামেরায় ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুমন চন্দ্র দেবনাথ, মোঃ সাইফুল ইসলাম এবং মোঃ এনামুল হক রুদ্র। তাঁদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ধর্মসাগরের এই সুরেলা সকাল এখন পৌঁছে যাচ্ছে দেশের নানা প্রান্তে।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিদিন প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিগুলো ইতোমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। অসংখ্য মানুষ এই আয়োজনের প্রশংসা করছেন এবং এটিকে সুস্থ জীবনযাপন ও বাংলা সংস্কৃতির এক অনুকরণীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। অনেকে মন্তব্য করছেন, এমন আয়োজন দেশের প্রতিটি শহরে গড়ে উঠলে নতুন প্রজন্মের কাছে লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।

ধর্মসাগর পাড়ের সকাল শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিন এখানে হাঁটতে ও ব্যায়াম করতে আসেন আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিক্ষক, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বয়স, পেশা কিংবা পরিচয়ের ভিন্নতা ভুলে সবাই একসঙ্গে স্বাস্থ্যচর্চা ও প্রাণের টানে মিলিত হন।

কেউ নিয়মিত হাঁটছেন, কেউ ব্যায়ামে ব্যস্ত। কেউ আবার বাদাম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। হাঁটা শেষে কেউ ডায়াবেটিস বা রক্তচাপ পরীক্ষা করছেন, কেউ বেঞ্চে বসে শান্ত জলরাশির দিকে তাকিয়ে উপভোগ করছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। আবার কেউ ধর্মসাগরের টাটকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কিনে বাড়ির পথে ফিরছেন।

অনেকেই সকালের হাঁটা শেষে কাছাকাছি রেস্টুরেন্টে গিয়ে নাস্তা করেন। বন্ধুদের সঙ্গে গল্প, চায়ের আড্ডা আর হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্তে শেষ হয় তাঁদের সকালের সময়। স্বাস্থ্যচর্চা, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের এমন অপূর্ব সমন্বয় খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।

ধর্মসাগরের ভোর আজ শুধু একটি সকালের দৃশ্য নয়; এটি কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক। যেখানে লোকসংগীত মানুষকে শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, ব্যায়াম শেখায় সুস্থ থাকার বার্তা, আর প্রকৃতি মনে করিয়ে দেয় জীবনের নির্মল সৌন্দর্য।

প্রতিদিন সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মসাগর পাড়ে যেন নতুন করে জেগে ওঠে বাংলার প্রাণ। ঢোলের তালে, একতারার সুরে, লালনের দর্শনে আর ভাটিয়ালির আবেগে মুখরিত হয় চারপাশ। সেখানে উপস্থিত প্রত্যেক মানুষ যেন অনুভব করেন—সংস্কৃতি মানুষকে এক করে, সংগীত হৃদয়কে স্পর্শ করে, আর প্রকৃতি শেখায় জীবনকে ভালোবাসতে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই অনন্য আয়োজন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় ধর্মসাগরের সুপ্রভাত মঞ্চ আরও সমৃদ্ধ হবে এবং দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে কুমিল্লার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সুস্থ জীবনচর্চার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে।

ধর্মসাগরের ভোর তাই আজ কেবল একটি সকাল নয়—এটি এক জীবন্ত সংস্কৃতি, এক মানবিক মিলনমেলা, এক সুস্থ জীবনের বার্তা এবং বাংলার লোকঐতিহ্যকে ধারণ করে এগিয়ে চলার এক অনবদ্য অধ্যায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page
Developed by: BD IT HOST