সময় বদলেছে, বদলায়নি বন্ধুত্ব: কুমিল্লায় এসএসসি ১৯৯৫ ব্যাচের তিন সহপাঠীর আবেগঘন পুনর্মিলনী
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
জীবনের পথচলায় সময়ের চাকা থেমে থাকে না। একসময়ের স্কুলপড়ুয়া কিশোররা আজ প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী। কারও কাঁধে রাষ্ট্রের দায়িত্ব, কেউ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আদালতের অঙ্গনে, আবার কেউ ব্যবসার জগতে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। কিন্তু জীবনের হাজারো ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানও মুছে দিতে পারেনি স্কুলজীবনের নির্মল বন্ধুত্বের সেই অমলিন স্মৃতিগুলো।
ঠিক এমনই এক হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্তের সাক্ষী হলো কুমিল্লা নগরী। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা শহরের বাদুরতলাস্থ হামসাফার-এ চা-চক্রে মিলিত হন চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ১৯৯৫ ব্যাচের তিন প্রিয় সহপাঠী। দীর্ঘদিন পর দেখা হলেও যেন এক মুহূর্তেই ফিরে গেলেন নব্বইয়ের দশকের সেই সোনালি স্কুলজীবনে।
পুনর্মিলনীতে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ও কুমিল্লা আদালত অঙ্গনের সুপরিচিত মুখ অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফারুক হোসেন এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. মুক্তার আহমেদ প্রধান।
এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের সঙ্গে জমে ওঠে স্মৃতির আসর। কথার পরতে পরতে ফিরে আসে স্কুলের সেই শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ ভাগাভাগি করে বসা, টিফিনের ঘণ্টা, মাঠজুড়ে দৌড়ঝাঁপ, শিক্ষকদের স্নেহমাখা শাসন, পরীক্ষার উৎকণ্ঠা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কৈশোরের অসংখ্য হাসি-কান্নার গল্প। যেন কয়েক দশকের ব্যবধান মুহূর্তেই হারিয়ে যায় বন্ধুত্বের উষ্ণ আলিঙ্গনে।
আড্ডায় কখনো হাসির ঝরনা বয়ে গেছে, কখনো স্মৃতির আবেগে নীরব হয়ে উঠেছে পরিবেশ। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, সংগ্রাম, সাফল্য ও অভিজ্ঞতার গল্প ভাগাভাগি করতে গিয়ে তিন বন্ধুর চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক অনন্য তৃপ্তি। উপস্থিত প্রত্যেকেই অনুভব করেন—বন্ধুত্ব এমন এক সম্পর্ক, যার গভীরতা সময় দিয়ে নয়, হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে পরিমাপ করা হয়।
অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার বলেন, “বন্ধু মানেই নির্ভেজাল ভালোবাসা। স্কুলজীবনের বন্ধুত্বের মতো নির্মল সম্পর্ক আর দ্বিতীয়টি নেই। আজকের এই আড্ডা আমাকে আবারও সেই কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে, যেখানে ছিল না কোনো স্বার্থ, ছিল শুধু আন্তরিকতা।”
সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, “জীবনের ব্যস্ততা মানুষকে অনেক দূরে নিয়ে যায়, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনো দূরে সরে যায় না। বহু বছর পর একসঙ্গে বসেও মনে হয়েছে যেন গতকালই আমরা একই বেঞ্চে বসে ক্লাস করেছি।”
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. মুক্তার আহমেদ প্রধান বলেন, “বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো কয়েকটি ঘণ্টা মনকে যে প্রশান্তি দেয়, তা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এই সম্পর্ক আজীবন অটুট থাকুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
চা-চক্রটি ছিল না শুধুই আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ। এটি ছিল ভালোবাসা, স্মৃতি, শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা এবং আজীবন লালন করা বন্ধুত্বের এক অনন্য উদযাপন। তিন বন্ধু ভবিষ্যতে ইন্দুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি ১৯৯৫ ব্যাচের সব সহপাঠীকে নিয়ে একটি বৃহৎ পুনর্মিলনী আয়োজনের ইচ্ছাও প্রকাশ করেন।
সমাজবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ সম্পর্কগুলোর একটি হলো স্কুলজীবনের বন্ধুত্ব। সেখানে নেই কোনো পদমর্যাদার বিভেদ, নেই অর্থ কিংবা স্বার্থের হিসাব—আছে শুধু একে অপরের প্রতি অকৃত্রিম টান। কুমিল্লার এই ছোট্ট পুনর্মিলনী যেন সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল।
দিনশেষে আড্ডা শেষ হয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি স্মৃতির গল্প। বিদায়ের আগে তিন বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আবারও দেখা করার প্রতিশ্রুতি দেন। কারণ, সত্যিকারের বন্ধুত্ব ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীরে। সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দিতে পারে, কিন্তু শৈশব-কৈশোরের নির্মল বন্ধুত্ব কখনো পুরোনো হয় না—বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর, আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
এই পুনর্মিলনী যেন প্রমাণ করে দিল, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সম্পদ পদ-পদবি বা সম্পদ নয়; বরং এমন কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে বহু বছর পর দেখা হলেও মনে হয়—কোনো দিনই দূরে ছিলাম না।