July 25, 2026, 9:09 pm
শিরোনাম:
কুমিল্লায় স্মৃতিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতাঞ্জলি অনুষ্ঠিত সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আলোচনার শীর্ষে সাবেক ভিপি শামীম খান কুমিল্লায় উল্টো রথযাত্রা মহোৎসবে লাখো ভক্তের ঢল রামুতে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের উল্টো রথযাত্রা উৎসব উদযাপিত হয়েছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় যুবক আটক সিংড়ায় এমপি আনুকে সংবর্ধনা দিল কৃষি ডিপ্লোমা ইন্সটিটিউট যৌনতা কেড়ে নিল শিক্ষকের আদর্শের চাদর!!! হরিনাহাটা বিপ্লবী ফুটবল ক্লাবের উদ্যোগে ২২তম ফাইনাল ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত ভাঙ্গুড়ায় খানমরিচ ইউনিয়ন বিএনপি’র দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল নির্বাচন ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্য: সভাপতি, সম্পাদক ও সাংগঠনিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারণা কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহাম্মদ সাইফুল মালিক আর নেই

কুমিল্লায় স্মৃতিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতাঞ্জলি অনুষ্ঠিত

রিপোর্টারের নাম

কুমিল্লায় স্মৃতিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতাঞ্জলি অনুষ্ঠিত

‘একতারা তুই দেশের কথা বল’—দেশাত্মবোধ, সংগীত ও স্মৃতির আবেগে মুখর এক অনন্য সন্ধ্যা

তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা।।

বাংলা গানের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের সৃষ্টি সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির চেতনা, অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম শব্দসৈনিক গাজী মাজহারুল আনোয়ার সেই বিরল কীর্তিমানদের একজন। তাঁর লেখা গান শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা, দেশপ্রেমের দীপ্ত উচ্চারণ, প্রেমের গভীর অনুভব এবং বাংলার মানুষের জীবনসংগ্রামের এক অনন্য দলিল। তাঁর অমর সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের লক্ষ্যে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘স্মৃতিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতাঞ্জলি’।

“একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার, আমাকে তুই বাউল করে সঙ্গে নিয়ে চল”—বাংলার মাটি, মানুষ ও দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠা এই কালজয়ী গানের প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শনিবার (২৫ জুলাই ২০২৬) সন্ধ্যায় কুমিল্লা নগরীর কান্দিরপাড় টপটেন ভবনের চতুর্থ তলায় গ্র্যান্ড দেশপ্রিয় কনভেনশন হলে কুমিল্লা অধুনা থিয়েটারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ব্যতিক্রমধর্মী এই সাংস্কৃতিক আয়োজন। অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেন অধুনা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল হক স্বপন।

অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই মিলনায়তনে ভিড় করেন সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দর্শক। পুরো হলজুড়ে ছিল এক আবেগঘন পরিবেশ। মঞ্চজুড়ে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের আলোকচিত্র, তাঁর সৃষ্টিকর্মের স্মৃতিচিহ্ন এবং পেছনে ভেসে আসা তাঁর লেখা অমর গান যেন উপস্থিত সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বাংলা গানের সোনালি সময়ের কাছে।

অনুষ্ঠানে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জীবন, কর্ম ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন দেশের প্রখ্যাত সুরকার শেখ সাদী খান, প্রয়াত গাজী মাজহারুল আনোয়ারের সহধর্মিণী জোহরা গাজী, তাঁর ছোট ভাই ইমরুল আনোয়ার লিটন এবং পুত্র সরফরাজ আনোয়ার (উপল)। প্রত্যেকেই স্মরণ করেন একজন শিল্পী নয়, একজন স্নেহময় মানুষ, দেশপ্রেমিক এবং নিরহংকার ব্যক্তিত্বকে, যিনি সারাজীবন সৃষ্টিকে মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন।

বিশেষ পরিবেশনায় অংশ নেন প্রয়াত গীতিকারের কন্যা ও সংগীতশিল্পী দিঠি আনোয়ার। বাবার লেখা গান নিজের কণ্ঠে পরিবেশন করতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর কণ্ঠে যেন ধ্বনিত হচ্ছিল একজন কন্যার ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আজীবনের স্মৃতি। দর্শকরাও নীরবে সেই আবেগ ভাগ করে নেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আয়োজক পর্ষদের আহ্বায়ক প্রফেসর মো. জামাল নাছের। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সদস্য সচিব রাশেদুল করিম সজীব। সভাপতিত্ব করেন অধুনা থিয়েটারের সভাপতি অধ্যক্ষ কবির আহমেদ। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অধুনা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শহীদুল হক স্বপন, যিনি অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্বে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের জীবন ও সৃষ্টির নানা অজানা দিক তুলে ধরেন।

সন্ধ্যার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ও আকর্ষণীয় পর্ব ছিল গাজী মাজহারুল আনোয়ারের অমর সৃষ্টিগুলোর পরিবেশনা। একের পর এক কালজয়ী গান যেন স্মৃতির দরজা খুলে দেয়। প্রতিটি সুরে, প্রতিটি কথায় ফুটে ওঠে দেশপ্রেম, প্রেম, বিরহ, মানবিকতা ও জীবনের গভীর দর্শন।

অনুষ্ঠানের সূচনায় কণ্ঠশিল্পী খিজির হায়াত টিপু পরিবেশন করেন হৃদয়ছোঁয়া গান “আমার এই মন আমি”। এরপর ইমরান মাসুদ সুরেলা কণ্ঠে গেয়ে শোনান “তোমারই পরশে”। নাজনীন কাজল প্রাণবন্ত পরিবেশনায় শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন “ইশারায় শিস দিয়ে” গানটি গেয়ে। শিউলী রায় আবেগঘন কণ্ঠে পরিবেশন করেন “গানের খাতায় স্বরলিপি”, যা উপস্থিত দর্শকদের হৃদয়ের গভীরে দাগ কেটে যায়। ইশতিয়াক আহমেদ পল্লব গেয়ে শোনান নস্টালজিয়ায় মোড়া কালজয়ী গান “পিচঢালা এই পথটারে”। কামাল খান শক্তিশালী কণ্ঠে পরিবেশন করেন “ভেঙেছে পিঞ্জর”। অনামিকা দেব হৃদয়ের গভীর অনুভূতি দিয়ে গেয়ে শোনান “পারিনা ভুলে যেতে”। আর সমাপনী পরিবেশনায় সুষ্মিতা রায় কণ্ঠে তুলে ধরেন চিরসবুজ গান “শুধু গান গেয়ে পরিচয়”।

প্রতিটি গান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন। অনেক দর্শক শিল্পীদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়েছেন তাঁদের প্রিয় গান। কারও চোখে ছিল অশ্রু, কারও মুখে ছিল স্মৃতিমাখা হাসি। মনে হচ্ছিল, গাজী মাজহারুল আনোয়ার হয়তো শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁর শব্দ, তাঁর সুর, তাঁর চেতনা এবং তাঁর অমর সৃষ্টি যেন সেদিন পুরো মিলনায়তনে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি গান নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে—প্রকৃত শিল্পীরা কখনো হারিয়ে যান না; তাঁরা তাঁদের সৃষ্টির মধ্য দিয়েই মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লার বিশিষ্ট সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অসংখ্য মানুষ। তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, গাজী মাজহারুল আনোয়ার কেবল একজন গীতিকার নন; তিনি বাঙালির আত্মা, আবেগ, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বক্তাদের আবেগঘন বক্তব্য

বক্তারা বলেন, “গাজী মাজহারুল আনোয়ার চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি কখনো হারিয়ে যাবে না। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, ততদিন তাঁর গান মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হবে। তিনি শুধু গান লেখেননি, তিনি একটি জাতির অনুভূতি, স্বাধীনতার চেতনা, দেশপ্রেম ও ভালোবাসাকে শব্দে রূপ দিয়েছেন। তাঁর কলম ছিল মানুষের হৃদয়ের ভাষা।”

তাঁরা আরও বলেন, “আজকের প্রজন্মকে গাজী মাজহারুল আনোয়ারকে জানতে হবে, তাঁর গানকে জানতে হবে। কারণ তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি একটি ইতিহাস, প্রতিটি শব্দ একটি সময়ের দলিল, প্রতিটি সুর একটি জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর লেখা গান মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

বাংলা গানের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে জন্মগ্রহণ করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। কুমিল্লা জিলা স্কুল, ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করলেও চিকিৎসা পেশার পরিবর্তে তিনি বেছে নেন শিল্প-সংস্কৃতির পথ। সেই পথেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সংগীত ও চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

প্রায় ছয় দশকের কর্মজীবনে তিনি রচনা করেছেন ২০ হাজারেরও বেশি গান। বিবিসি বাংলার সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান পেয়েছে তাঁর লেখা তিনটি অমর সৃষ্টি—‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল’ এবং ‘একবার যেতে দে না’। এছাড়া তিনি প্রায় ৪১টি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘শাস্তি’, ‘ক্ষুধা’, ‘চুড়িওয়ালা’ এবং ‘এই যে দুনিয়া’।

তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেন একুশে পদক (২০০২), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০২১), পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ গীতিকার) এবং প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল (১৯৭২)।

২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর বিদায় ছিল কেবল দেহের। তাঁর লেখা গান, তাঁর সুর, তাঁর দেশপ্রেম এবং তাঁর শিল্পচেতনা আজও কোটি বাঙালির হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে আছে।

‘স্মৃতিতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার গীতাঞ্জলি’ শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল একজন কালজয়ী শিল্পীর প্রতি গভীর ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার নিবেদন। অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত যেন উচ্চারণ করেছে একটাই সত্য—মানুষ চলে যায়, কিন্তু মহৎ সৃষ্টি কখনো মরে না; তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে আলোর মশাল হয়ে পথ দেখায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page
Developed by: BD IT HOST