রংপুরের পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কুমিল্লায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল
‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ করুন, জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনুন’—বক্তারা
নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা থেকে।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী পুত্র প্রীয়ম চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী কন্যা আগামী চক্রবর্তীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং সারাদেশে চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল।
শনিবার (২৯ আগস্ট ২০২৬) বিকেল ৪টা থেকে কুমিল্লা নগরীর প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ের পূবালী চত্বরে সম্মিলিত সনাতনী ঐক্য জোট, কুমিল্লা-এর উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একটি পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করেনি—এটি দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। একটি অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী, স্কুলপড়ুয়া সন্তান এবং উচ্চশিক্ষার্থী কন্যার প্রাণ কেড়ে নেওয়ার মতো ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক কিংবা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তারা।
বক্তারা বলেন, মানুষের পরিচয় তার ধর্ম দিয়ে নয়, মানুষের পরিচয় তার মানবিকতা দিয়ে। অথচ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, ভয় ও সহিংসতা যদি কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা কেড়ে নেয়, তাহলে তা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষ যেন আতঙ্কে দিন কাটাতে বাধ্য না হয়—এমন একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশের দাবি জানান তারা।
মানববন্ধনে বক্তারা রংপুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডসহ সারাদেশে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলো তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
কর্মসূচিতে অংশ নেন—বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক ও কুমিল্লা শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী কমিটির আহ্বায়ক শ্রী শ্যামল কৃষ্ণ সাহা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক কমল চন্দ খোকন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার সিনিয়র সহ-সভাপতি অচিন্ত্য দাশ টিটু, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার সহ-সভাপতি দীলিপ কুমার নাগ কানাই, কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি দিলীপ মজুমদার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব সঞ্জিত দেবনাথ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক উত্তম সরকার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক পিংকু চন্দ, সাংগঠনিক সম্পাদক সুব্রত চৌধুরী তপু, রামনবমী উদযাপন পরিষদ কুমিল্লার সভাপতি কিশোর দাস, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশীষ দাস এবং বাংলাদেশ যুব ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দে প্রমুখ।
এছাড়াও কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ কুমিল্লা জেলা শাখার সমন্বয়ক আব্দুর রাজ্জাক এবং সিপিবি নেতা শেখ আঃ মান্নান।
বক্তারা বলেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে শুধু কোনো একটি সম্প্রদায়ের মানুষ নয়, দেশের সব বিবেকবান নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একটি পরিবার যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখন সেই ভয় শুধু একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের প্রতিটি মানুষের মনে। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তারা আরও বলেন, রংপুরের হত্যাকাণ্ডের মতো বর্বর ও হৃদয়বিদারক ঘটনার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঘটনার নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদের পরিচয় ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন অপরাধীদের আরও উৎসাহিত না করে, সেদিকেও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তারা।
মানববন্ধনে বক্তারা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু—কোনো পরিচয়ই যেন একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
কর্মসূচিতে বক্তারা আরও ঘোষণা দেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
পুরো কর্মসূচিতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মধুসূদন বিশ্বাস।
মানববন্ধন শেষে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে কুমিল্লা নগরীর রাজপথ। অংশগ্রহণকারীরা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে রংপুরের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধের দাবি জানান।
পরে পূবালী চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি নগরীর মনোহরপুর ও রাজগঞ্জ হয়ে মহেশাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
এ সময় বক্তারা আবারও বলেন, সাম্প্রদায়িকতার কাছে মানবতা পরাজিত হতে পারে না। একটি নিরাপদ বাংলাদেশে প্রত্যেক নাগরিকের সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। রংপুরের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারসহ সারাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তারা।