চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনায় সুপ্রভাত মঞ্চের সদস্যদের স্মরণীয় আনন্দভ্রমণ
গান, আড্ডা, ইলিশের স্বাদ আর নির্মল আনন্দে কেটেছে ব্যস্ত জীবনের অন্যরকম একদিন
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
নগরজীবনের শত ব্যস্ততা, কর্মচাঞ্চল্য আর প্রতিদিনের চেনা ছন্দকে কিছু সময়ের জন্য দূরে সরিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে, গান-আড্ডা ও আনন্দে একটি স্মরণীয় দিন কাটালেন কুমিল্লা সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। ইলিশের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরের তিন নদীর মোহনা এবং মতলব উত্তর উপজেলার মনোরম মোহনপুর পিকনিক স্পট ঘুরে শুক্রবার, ২১ আগস্ট ২০২৬ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এ আনন্দভ্রমণ পরিণত হয় নির্মল আনন্দ ও হৃদ্যতার এক মিলনমেলায়।
সকাল থেকেই ছিল সবার মধ্যে উৎসবের আমেজ। শুক্রবার সকাল ৮টায় কুমিল্লা নগরীর ঐতিহ্যবাহী টাউনহল মাঠ থেকে মাইক্রোবাসযোগে আনন্দভ্রমণের যাত্রা শুরু হয়। দাউদকান্দি হয়ে প্রায় দুপুর ১২টার দিকে সবাই পৌঁছান মতলব উত্তর উপজেলার মোহনপুরে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে পৌঁছানোর পরও ক্লান্তির কোনো ছাপ ছিল না কারও চোখেমুখে। বরং প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ, ঘোরাঘুরি ও হাসি-আড্ডায় মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় পুরো দল।
মোহনপুরে কিছুটা সময় কাটানোর পর এমভি সমতা সমৃদ্ধি-১ লঞ্চে চেপে সবাই রওনা হন চাঁদপুরের মোহনার উদ্দেশ্যে। নদীর বুকে চলতে চলতে একসময় চারপাশের দৃশ্য যেন হয়ে ওঠে এক জীবন্ত ক্যানভাস। নদীর ঢেউ, খোলা আকাশ, বাতাসের শীতল পরশ আর প্রিয়জনদের সান্নিধ্য—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ।
লঞ্চে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আসর। সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের মুখপাত্র অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী জারি, সারি ও ভাটিয়ালি গান পরিবেশন করে সবাইকে মুগ্ধ করেন। তাঁর কণ্ঠের লোকজ সুর নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যেন ভাসিয়ে নেয় সবাইকে। এর সঙ্গে ঢোল ও একতারা বাজিয়ে আসর জমিয়ে তোলেন মঞ্চের সদস্য অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার। হারমোনিয়ামে সুরের মূর্ছনা ছড়ান কীবোর্ড বাদক ভূষণ সূত্রধর। অন্য সদস্যরাও করতাল ও ঝুরি বাজিয়ে গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আনন্দকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।
নদীর বুকে এমন প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন উপস্থিত সবার মধ্যে তৈরি করে অন্যরকম আবেগ। কেউ গানের তালে দুলেছেন, কেউ হাততালি দিয়েছেন, আবার কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে ব্যস্ত ছিলেন ছবি ও ভিডিও ধারণে। মনে হচ্ছিল, ব্যস্ততার জীবনে হারিয়ে যাওয়া নির্মল আনন্দের দিনটি যেন ফিরে এসেছে সবার কাছে।
দুপুর পৌনে ২টার দিকে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে পৌঁছান আনন্দভ্রমণের সদস্যরা। এরপর সবাই মধ্যাহ্নভোজে মিলিত হন ‘ক্যাফে মোহনা’ রেস্টুরেন্টে। আর চাঁদপুরে এসে ইলিশের স্বাদ না নিলে যেন ভ্রমণই অপূর্ণ! তাই মধ্যাহ্নভোজের আয়োজনে ছিল তরতাজা ইলিশ মাছ ভাজা। সঙ্গে ছিল তাল-বেগুন ভাজা, আলু ভর্তাসহ আরও নানা মুখরোচক খাবার। নদীর পাড়ের পরিবেশে চাঁদপুরের বিখ্যাত ইলিশের স্বাদ যেন আনন্দভ্রমণের স্মৃতিতে যোগ করে দেয় বিশেষ এক মাত্রা।
মধ্যাহ্নভোজ শেষে দলটি যায় চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী বড় স্টেশন মোহনায়। সেখানে কিছুটা সময় ঘোরাঘুরি, নদীর সৌন্দর্য উপভোগ এবং গল্প-আড্ডায় কাটে আনন্দঘন সময়। কেউ ডাবের পানি পান করেন, কেউ উপভোগ করেন আখের রস। প্রকৃতির মনোরম পরিবেশে আবারও শুরু হয় গান। মুহূর্তেই বড় স্টেশন মোহনা পরিণত হয় ছোট্ট এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।
দিন যত গড়াতে থাকে, ততই বাড়তে থাকে ফিরে যাওয়ার সময়ের আক্ষেপ। কিন্তু স্মৃতির ঝুলিতে তখন জমা হয়ে গেছে অসংখ্য আনন্দঘন মুহূর্ত। বিকেল ৫টার দিকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে চাঁদপুর ত্যাগ করেন সবাই। ফেরার পথেও ছিল হাসি-আড্ডা ও আনন্দের রেশ। পথিমধ্যে বাকিলা এলাকায় গরম গরম মিষ্টির স্বাদ নিয়ে আরও এক দফা আনন্দ ভাগাভাগি করেন ভ্রমণসঙ্গীরা।
অবশেষে রাত ৮টার দিকে কুমিল্লা টাউনহল মাঠে পৌঁছায় আনন্দভ্রমণের বহর। এরপর সবাই যার যার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দিনভর একসঙ্গে থাকার পর বিদায়ের মুহূর্তে অনেকের মনেই ছিল তৃপ্তি, আনন্দ এবং আবারও এমন একটি আয়োজনের প্রত্যাশা।
এ আনন্দভ্রমণের পুরো আয়োজনের নানা মুহূর্ত ভিডিওতে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন সুপ্রভাত মঞ্চের সদস্য ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুমন চন্দ্র দেবনাথ এবং মোঃ সাইফুল ইসলাম। ফলে যারা সরাসরি এই ভ্রমণে অংশ নিতে পারেননি, তারাও ভিডিওর মাধ্যমে আনন্দের মুহূর্তগুলোর কিছুটা স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পান।
আনন্দভ্রমণে আরও অংশ নেন অধ্যক্ষ তপন সাহা, প্রফেসর নিখিল রায়, প্রফেসর অনুকূল চন্দ্র দাশ, প্রফেসর মৃনাল কান্তি গোস্বামী, সাবেক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার প্রসাদ কুমার ভাওয়াল, বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক অমৃত লাল দত্ত, মোঃ মোতালেব খান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেপাল চন্দ্র দাশ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী গৌতম দাশ এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কার্তিক করসহ আরও অনেকে।
শুধু একটি ভ্রমণ নয়, দিনটি যেন ছিল পারস্পরিক সৌহার্দ্য, বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি ও ভালোবাসার এক অনন্য উৎসব। জীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে কাছের মানুষদের নিয়ে এমন একটি দিন যে কতটা প্রশান্তি দিতে পারে, চাঁদপুরের নদী, ইলিশের স্বাদ আর লোকজ গানের সুরে কাটানো দিনটি তারই প্রমাণ।
সুপ্রভাত ধর্মসাগর পাড় মঞ্চের সদস্য ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য ২১ আগস্টের এই আনন্দভ্রমণ তাই নিছক একটি ভ্রমণ হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় করার, মনকে সতেজ করার এবং স্মৃতির পাতায় একটি উজ্জ্বল দিন লিখে রাখার উপলক্ষ।
নদীর ঢেউ হয়তো থেমে গেছে, লঞ্চ ফিরে এসেছে ঘাটে, গানও থেমেছে অনেক আগেই—কিন্তু চাঁদপুরের মোহনায় কাটানো সেই হাসি, আড্ডা, গানের সুর আর একসঙ্গে থাকার আনন্দ দীর্ঘদিন সবার হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। সত্যিই, আজকের এই দিনটি তাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বহুদিন।