June 30, 2026, 8:00 pm
শিরোনাম:
৩৯ বছরের শিক্ষকতা শেষে রাজকীয় বিদায়, ফুলে সাজানো গাড়িতে বাড়ি ফিরলেন প্রধান শিক্ষক সুখরঞ্জন বিশ্বাস পলাশ বাড়ী উপজেলায় আসামিদের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে বাদী মানবেতর জীবনযাপন নিরাপত্তা দাবি নরসিংদীর শিবপুরের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া। বান্দরবানের লামায় জমি বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনায় বৈঠকে এএসপি এর মধ্যস্থতায় সমঝোতা গলাচিপায় পুলিশের অভিযানে ১০(দশ) পিস ইয়াবা সহ এক মাদক কারবারি কে আটক করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠিত কুমিল্লায় কাল জগন্নাথ দেবের স্নান উৎসব বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সিরাজগঞ্জে বিভিন্ন জায়গায় জনজীবন বিপর্যস্ত: মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা কুমিল্লায় জগন্নাথ দেবের স্নান উৎসব পালিত: ভক্তদের ঢল, ধর্মীয় আবহে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গণ ইমামের সঙ্গে সম্পর্কের দাবি নারীর, বাড়ি থেকে আটকের অভিযোগে চাঞ্চল্য রায়গঞ্জে

৩৯ বছরের শিক্ষকতা শেষে রাজকীয় বিদায়, ফুলে সাজানো গাড়িতে বাড়ি ফিরলেন প্রধান শিক্ষক সুখরঞ্জন বিশ্বাস

রিপোর্টারের নাম

৩৯ বছরের শিক্ষকতা শেষে রাজকীয় বিদায়, ফুলে সাজানো গাড়িতে বাড়ি ফিরলেন প্রধান শিক্ষক সুখরঞ্জন বিশ্বাস

তাপস চন্দ্র সরকার, মতলব (চাঁদপুর)।।
দীর্ঘ ৩৮ বছর ৮ মাস ২০ দিনের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ১২৪নং নন্দলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুখ রঞ্জন বিশ্বাস। কর্মজীবনের শেষ দিনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি পেলেন এক ব্যতিক্রমী ও রাজকীয় বিদায়। ফুলে সজ্জিত একটি প্রাইভেটকারে করে তাঁকে নিজ বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হয়। আবেগঘন এই বিদায় অনুষ্ঠান স্থানীয়দের মাঝেও ব্যাপক প্রশংসার জন্ম দেয়।
সোমবার (২৯ জুন ২০২৬) বিকেলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সৃষ্টি হয় আবেগময় পরিবেশ। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক সুখ রঞ্জন বিশ্বাসকে ফুলেল শুভেচ্ছা এবং সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বক্তব্যে তাঁদের প্রিয় শিক্ষকের কর্মময় জীবনের নানা স্মৃতিচারণ করেন। অনেকেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন।
বিদায়ী বক্তব্যে সুখ রঞ্জন বিশ্বাস শিক্ষকতা জীবনের সুখ-দুঃখের নানা স্মৃতি স্মরণ করে সহকর্মী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন- মতলব উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আনিছুর রহমান, চরপাথালীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রীকৃষ্ণ পাল, সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি আব্দুল বাতেন, উপজেলা স্কাউট কমিশনার শাহজাহান, উপজেলা স্কাউট সম্পাদক আক্তার হোসেন, উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশিকুজ্জামান, বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সুমন খান, ডা. মোহন মিয়া, সহকারী শিক্ষক পারুল রানী বিশ্বাস, সালেহা আক্তার, বিল্লাল হোসেন, হাসনেয়ারা আক্তার ও ঝুমুর আক্তারসহ অনেকে।
অনুষ্ঠান শেষে ফুল দিয়ে সুসজ্জিত একটি প্রাইভেটকারে করে প্রধান শিক্ষক সুখ রঞ্জন বিশ্বাসকে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। পথজুড়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী হাত নেড়ে এবং ফুল ছিটিয়ে তাঁকে বিদায় জানান। আবেগঘন সেই মুহূর্তে উপস্থিত অনেকের চোখেই ছিল অশ্রু।
জানা যায়, সুখ রঞ্জন বিশ্বাস ১৯৮৭ সালের ১০ অক্টোবর সাদুল্ল্যাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। পরে ১৯৮৮ সালের ১০ অক্টোবর দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৯৬ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি নন্দলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীর্ঘ সময় দক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২৬ সালের ২৯ জুন তিনি অবসরে যান।
সহকর্মীদের ভাষ্য, সুখ রঞ্জন বিশ্বাস শুধু একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষকই নন, তিনি ছিলেন বিদ্যালয়ের অভিভাবক, পরামর্শদাতা ও আদর্শ মানুষ। তাঁর সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং শিক্ষার প্রতি নিবেদন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
ব্যক্তিগত জীবনে সুখ রঞ্জন বিশ্বাস স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক। বড় ছেলে একজন ব্যাংকার, মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছোট ছেলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।

বিদায়ী বক্তব্যে আবেগঘন কণ্ঠে সুখ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, “দীর্ঘ কর্মজীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে আজ আমি সত্যিই আবেগাপ্লুত। নন্দলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শুধু আমার কর্মস্থল ছিল না, এটি আমার দ্বিতীয় পরিবারে পরিণত হয়েছিল। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো আমি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাটিয়েছি। এখানকার প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও অভিভাবকের সঙ্গে আমার অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
আজ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু এই বিদ্যালয়ের প্রতি আমার ভালোবাসা, মমত্ববোধ ও আত্মিক সম্পর্ক কখনো শেষ হবে না। আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষক অবসরে যেতে পারেন, কিন্তু শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ কখনো অবসর নেয় না। শিক্ষকতা আমার কাছে কেবল একটি চাকরি ছিল না; এটি ছিল একটি মহান ব্রত, একটি পবিত্র দায়িত্ব। আমি সবসময় চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। আমার শিক্ষার্থীরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সৎ, আদর্শ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক—এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আজ বিদায়ের এই ক্ষণে আপনাদের সবার যে অকৃত্রিম ভালোবাসা, সম্মান ও আন্তরিকতা পেয়েছি, তা আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি হয়ে থাকবে। আমি বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি এবং এলাকার সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনারা সবসময় আমাকে সহযোগিতা করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন এবং ভালোবেসেছেন। আমি সবার কাছে দোয়া ও আশীর্বাদ কামনা করছি। আমার কোনো ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমি আজীবন এই বিদ্যালয়ের উন্নতি, সাফল্য ও শিক্ষার্থীদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি। আপনাদের ভালোবাসা আমি হৃদয়ে ধারণ করে রাখব আজীবন।”
শিক্ষার্থীদের অশ্রুসিক্ত চোখ এবং সহকর্মীদের আবেগঘন বিদায় যেন আরেকবার প্রমাণ করল—একজন প্রকৃত শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন পদ-পদবি বা পুরস্কার নয়; বরং শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page
Developed by: BD IT HOST