**বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন**
**বদলগাছীতে বিকাশ ব্যবসায়ী সাহিদের বিরুদ্ধে ওটিপি হ্যাক, চড়া সুদ ও হয়রানিমূলক মিথ্য মামলার পাহাড়: অতিষ্ঠ এলাকাবাসী**
**নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি:**
নওগাঁর বদলগাছীতে মোঃ সাহিদ হোসেন (২৬) নামের এক বিকাশ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রাহকের বিকাশ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাৎ, চড়া সুদের অবৈধ কারবার এবং আদালতের মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। এলাকাটিকে ডিজিটাল আর্থিক সেবার নিরাপত্তার জন্য তিনি এখন এক আতঙ্কের নাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও মানুষের সরলতাকে হাতিয়ার বানিয়ে প্রতারণার জাল বিছিয়েছেন সাহিদ। অর্থ লেনদেনের ফাঁদে ফেলে ব্যাংক চেক হাতিয়ে নেওয়া এবং পরবর্তীতে ভুয়া ঋণের দাবি তুলে আদালতে মামলা ঠুকে মানুষকে সামাজিক ও মানসিকভাবে ধ্বংস করাই তাঁর মূল কৌশল।
**ভুক্তভোগীদের রোমহর্ষক জবানবন্দি**
* **ওটিপি হাতিয়ে পুরো পরিবারকে জেলখাটানো:** উপজেলার লক্ষীকুল গ্রামের আছমা বেগম জানান, ২০২২ সালে বিকাশ পিন ঠিক করার কথা বলে সাহিদ কৌশলে তাঁর মোবাইলের ওটিপি (OTP) হাতিয়ে নেন। এরপর থেকে তাঁর অ্যাকাউন্টে আসা টাকা অন্য নম্বরে সরাতে থাকেন সাহিদ। একপর্যায়ে আছমার মেয়ের কাছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা পাওনা দাবি করেন, অথচ তাঁদের মধ্যে কোনো লেনদেনই ছিল না। পরবর্তীতে আছমা বেগম, তাঁর মেয়ে এবং শ্বশুর বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মজনু রহমানের বিরুদ্ধে আদালতে সিআর মামলা (নং-২৮৬/২২) দায়ের করেন সাহিদ। এই মিথ্যা মামলায় বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ পরিবারটিকে ১৩ দিন জেল খাটতে হয় এবং অবশেষে ৩ বছর পর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে আপস করতে বাধ্য হন তারা।
* **চেক জালিয়াতি ও গ্রেফতারি পরোয়ানা:** জিধিরপুর গ্রামের বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক মোঃ আরিফ উল করিম রাব্বি জানান, উল্টো সাহিদের কাছেই তাঁর ৪৫ হাজার টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়িক সূত্রে সাহিদের কাছে থাকা ১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি ব্যাংক চেক ব্যবহার করে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা (নং-৪৩৫/২৫) ঠুকে দেন সাহিদ। কোনো আগাম সমন ছাড়াই হঠাৎ পুলিশ আরিফকে গ্রেফতার করে।
* **হঠাৎ শূন্য থেকে কোটিপতি:** ভুক্তভোগী আরিফ জানান, ভ্যানচালকের ছেলে সাহিদ একসময় কাঠের দোকানের কর্মচারী ছিলেন। হঠাৎ বিকাশ ব্যবসা ও চড়া সুদের অবৈধ কারবার শুরু করে তিনি এখন কোটিপতি। সাহিদের এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আশু হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
**তদন্ত কর্মকর্তাকেও ছাড় দেন না সাহিদ**
বদলগাছী থানার এক তদন্ত কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) জানান, সাহিদ নিজের ইচ্ছেমতো তদন্ত রিপোর্ট না পেলে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, সিকিউরিটি সেল ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করেন। উদাহরণস্বরূপ, শাকিল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৪ লাখ টাকার সিআর মামলা (নং-১০৩, ধারা ৪০৬/৪২০) করেছিলেন সাহিদ। তদন্তে মাত্র ৫৪ হাজার টাকার সত্যতা পাওয়ায় ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন দপ্তরে ভুয়া অভিযোগ দায়ের করেন তিনি।
**অভিযুক্তের বক্তব্য ও সুশীল সমাজের উদ্বেগ**
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত সাহিদ হোসেন সব দাবি অস্বীকার করে বলেন, তিনি এসবের কিছুই জানেন না। তবে এ নিয়ে কোনো সংবাদ প্রকাশ করে তাঁর মানহানি করা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেবেন বলে হুমকি দেন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, বিকাশ অ্যাকাউন্টের ওটিপি হাতিয়ে নেওয়া এবং ব্ল্যাকমেইল করে সাধারণ মানুষকে ভুয়া মামলায় ফাসানোর ঘটনা ডিজিটাল আর্থিক নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। তাঁরা অতি দ্রুত সাহিদ হোসেনের প্রতারণা ও চড়া সুদের ব্যবসা বন্ধসহ তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।