নওগাঁয় শয়তানের নিঃশ্বাসে সর্বস্ব লুট: চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তার
মো: রাফি হোসেন, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি
নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এক সফল অভিযান চালিয়ে চাঞ্চল্যকর ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ (স্কোপোলামিন) চক্রের ৩ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলো—মোঃ আবু হাসান, মোঃ বাবু এবং মোঃ সবুজ। তাদের সবার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার চনপাড়া এলাকায়।
শনিবার (২০ জুন, ২০২৬) টাঙ্গাইল পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। ইতিমধ্যে নওগাঁর কয়েকজন ভিকটিম (ভুক্তভোগী) গ্রেফতারকৃতদের দেখে শনাক্ত করেছেন।
অভিনব কায়দায় সম্মোহন ও লুটপাট
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে নওগাঁ শহরের বিভিন্ন স্থানে একদল অপরাধী বয়স্ক নারীদের টার্গেট করে আসছিল। তারা ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ বা ‘স্কোপোলামিন’ নামক এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক ভিকটিমের নাকে বা শরীরে প্রয়োগ করত। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে স্মৃতিলোপ (অ্যামনেসিয়া) বা সম্মোহিত অবস্থার শিকার হতেন এবং অপরাধীদের কথামতো কাজ করতে বাধ্য হতেন।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভিকটিম নিজেই নিজের কানের দুল, স্বর্ণালংকার ও টাকা-পয়সা অপরাধীদের হাতে স্বেচ্ছায় তুলে দিচ্ছেন, এমনকি সম্মোহিত অবস্থায় বাসায় গিয়ে আলমারি খুলে সব মূল্যবান জিনিসপত্র অপরাধীদের হাতে সঁপে দিচ্ছেন।
যেভাবে ধরা পড়ল এই চক্র
এই চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার পর নওগাঁ থানায় মোট ৩টি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্তে নেমে জেলা ডিবি পুলিশ বেশ কয়েকবার নারায়ণগঞ্জ জেলায় অভিযান চালায়। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিখুঁত ডাটা অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে যে, এই চক্রটি ২০ জুন টাঙ্গাইলে নতুন করে অপরাধ সংঘটনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
খবর পাওয়া মাত্রই নওগাঁ পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় একটি শক্তিশালী টিম টাঙ্গাইলে পাঠানো হয় এবং টাঙ্গাইল পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে হাতেনাতে এই ৩ অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়।
সারাদেশে সক্রিয় ৮-১০টি গ্রুপ
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে যে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ (চনপাড়া) এলাকা কেন্দ্রিক এই অপরাধী চক্রের আরও ৮ থেকে ১০টি গ্রুপ রয়েছে। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে এই কেমিক্যাল প্রয়োগের মাধ্যমে লুটে নিচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা নারায়ণগঞ্জ, নওগাঁ, খুলনা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কমপক্ষে ১০টি বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত করেছে।
অপরাধের কৌশল নিয়ে পুলিশ সুপারের বক্তব্য
এ প্রসঙ্গে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, এই চক্রটি মূলত নিঃসঙ্গ বা বয়স্ক নারীদের টার্গেট করে। অপরাধের কৌশল হিসেবে:
প্রথমে একজন সদস্য ভিকটিমের কাছে এসে কোনো সাহায্য চাওয়ার নাটক করে কথা বলতে শুরু করে।
এর পরপরই দ্বিতীয় আরেকজন সদস্য এসে কথায় যোগ দিয়ে ভিকটিমের মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়।
এই সুযোগে তৃতীয় সদস্য এসে ভিকটিমের অজান্তে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ বা কেমিক্যাল স্প্রে করে দেয়।
কেমিক্যাল শরীরে প্রবেশ করার পরই ভিকটিম নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অপরাধীদের কথামতো সবকিছু দিয়ে দেয়।
পুলিশ সুপার আরও জানান, নওগাঁ জেলা পুলিশ সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই ধরনের অভিনব অপরাধ চক্রকে পুরোপুরি নির্মূল করতে কঠোরভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। চক্রের বাকি সদস্যদের ধরতেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।