ঢাকায় বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত
তাপস চন্দ্র সরকার, ঢাকা থেকে ফিরে।।
‘ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়—ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই’ এবং ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এই শ্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় দেশের বর্তমান সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, হয়রানি, কথিত মিথ্যা মামলা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে একাধিক প্রস্তাব গৃহীত হয়।
শুক্রবার (১২ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর পুরানা পল্টন লাইনে অবস্থিত পল্টন টাওয়ারের চতুর্থ তলায় ইকোনোমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) মিলনায়তনে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের আয়োজনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক।
সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ এর সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য উষাতন তালুকদার ও নির্মল রোজারিও প্রমুখ।
এসময় উপস্থিত ছিলেন অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, কাজল দেবনাথ, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত সেন দীপু, মিলন কান্তি দত্ত, রমেন মণ্ডল, অ্যাডভোকেট তাপস কুমার পাল, উত্তম কুমার চক্রবর্তী ও শ্যামল পালিতসহ আরও অনেকে।
ওই সভায় কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী, আইসিটি সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক মধুসূদন বিশ্বাস লিটন, কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক কমল চন্দ খোকন, সদস্য সচিব সুকেন সরকার, জেলা যুব ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জনি সাহা, ডা. দীনেশ চন্দ্র দেবনাথসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগর থেকে আগত প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ্মাবতী দেবী। সভায় গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রঞ্জন কর্মকার। কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদকের প্রতিবেদন পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত।
সভায় বক্তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, মন্দির ও উপাসনালয়ে আক্রমণ এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এখনও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি ও সামাজিকভাবে হয়রানির ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনা শুধু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্যও উদ্বেগজনক। বক্তারা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক বৈষম্য, নির্যাতন কিংবা সহিংসতার শিকার হতে পারে না। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করাই সংবিধানের মূল চেতনা।
সভায় অবিলম্বে একটি কার্যকর ও যুগোপযোগী সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এমন একটি আইনের দাবি জানানো হলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার ব্যক্তিরা অনেক সময় ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইনগত সুরক্ষা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, চাঁদাবাজি, হামলা ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় নেতৃবৃন্দ দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কথিত হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তারা অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত তদন্ত ছাড়াই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি ও সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মামলায় জড়ানো হয়েছে, যার ফলে তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
বক্তারা বলেন, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রতিটি মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। তদন্তে যেসব মামলা ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হবে, সেগুলো দ্রুত প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ বহু ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ। এ দেশের অন্যতম শক্তি হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থান। এই ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তারা বলেন, ঘৃণা, বিভাজন ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সভা শেষে নেতৃবৃন্দ দেশের সকল নাগরিকের প্রতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি, সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।