ঐতিহ্যের আঙিনায় হৃদয়ের মিলন: ধর্মসাগর পাড় সুপ্রভাত মঞ্চ ও কাফেলা কুমিল্লার বর্ণিল মিলনমেলা
কুমিল্লা প্রতিনিধি।।
বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনস্থলে পরিণত হয়েছিল কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর ভুলিরপাড়ের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি গোবিন্দ ধাম। শুক্রবার দিনব্যাপী সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমিল্লা ধর্মসাগর পাড় সুপ্রভাত মঞ্চ ও কাফেলা কুমিল্লা-র যৌথ উদ্যোগে এক প্রাণবন্ত ও আবেগঘন মিলনমেলা।
আয়োজক সঞ্জয় কুমার সাহা-র আন্তরিক উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই মিলনমেলায় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাহিত্য ও গণমাধ্যম অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা একত্রিত হন। বহুদিনের পরিচিত মুখগুলো এক ছাদের নিচে মিলিত হয়ে যেন ফিরিয়ে আনেন হারিয়ে যাওয়া আন্তরিকতার দিনগুলো।
সকালের কোমল আলোয় অতিথিদের আগমনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। আগতদের উষ্ণ অভ্যর্থনার পর চা ও নাস্তার আপ্যায়নে জমে ওঠে প্রাণখোলা আড্ডা। দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়ায় একে অপরকে আলিঙ্গন, শুভেচ্ছা বিনিময় ও স্মৃতিচারণে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মিলনমেলায় উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা ধর্মসাগর পাড় সুপ্রভাত মঞ্চের মুখপাত্র তাপস কুমার বকসী, প্রফেসর অনুকূল চন্দ্র দাস, প্রফেসর মৃণাল কান্তি গোস্বামী, নেপাল চন্দ্র দাস, উত্তম দত্ত, শম্ভু রঞ্জন চৌধুরী, পরিমল চন্দ্র দাস, গৌতম দাস, সাংবাদিক তাপস চন্দ্র সরকার, সুজন চন্দ্র সরকারসহ অসংখ্য অতিথি।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রফেসর নিখিল রায়, অধ্যক্ষ বিধান চন্দ, বিশ্ব রঞ্জন চক্রবর্তীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের উপস্থিতিতে আয়োজনটি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত ও অর্থবহ।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। দুই সংগঠনের যৌথ আয়োজনে পরিবেশিত হয় জারি, সারি, ভান্ডারি ও লালন সংগীত। সাংস্কৃতিক আসরে কুমিল্লা ধর্মসাগর পাড় সুপ্রভাত মঞ্চের মুখপাত্র তাপস কুমার বকসী একের পর এক জনপ্রিয় লোকগীতি, ভক্তিমূলক ও হৃদয়ছোঁয়া গান পরিবেশন করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন। তাঁর সুরেলা কণ্ঠে পরিবেশিত গানগুলোতে দর্শক-শ্রোতারাও কণ্ঠ মিলিয়ে উৎসবের আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন। করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মিলনমেলার প্রাঙ্গণ।
অন্যদিকে সাংবাদিক ও এডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার দক্ষতার সঙ্গে ঢোল বাজিয়ে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় যোগ করেন ভিন্নমাত্রার উচ্ছ্বাস। ঢোলের তালে তালে অনেক অতিথি নেচে-গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন। গান, ঢোলের ছন্দ, হাসি-আনন্দ আর প্রাণখোলা আড্ডায় ঐতিহ্যবাহী গোবিন্দ ধামের পরিবেশ দিনভর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। উপস্থিত অতিথিরা বলেন, এমন প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আয়োজন দীর্ঘদিন তাঁদের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে।
ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ির নান্দনিক স্থাপত্য, সবুজে ঘেরা পরিবেশ এবং শতবর্ষের ইতিহাস যেন অতিথিদের মুগ্ধ করে রাখে। জমিদার বাড়িতে প্রবেশ করতেই অতিথিদের অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন মোবাইল ফোনে স্মৃতি ধরে রাখতে। কেউ তুলেছেন সেলফি, কেউবা দলবদ্ধ ছবি। ঐতিহ্যের পটভূমিতে তোলা এসব ছবি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত দক্ষতার সঙ্গে ক্যামেরাবন্দি করেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুমন চন্দ্র দেবনাথ। পাশাপাশি কাফেলা কুমিল্লার সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম হাজারী, মো. তপন তাহের, মো. গোলাম সারোয়ার, মো. ফজলুর রহমান, মো. মাহমুদউল্লাহ ও অমৃতলাল দত্ত বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেন। ফলে যারা উপস্থিত থাকতে পারেননি, তারাও অনলাইনে অনুষ্ঠানটির প্রাণবন্ত পরিবেশ উপভোগ করার সুযোগ পান।
দুপুরে অতিথিদের জন্য পরিবেশন করা হয় সুস্বাদু মধ্যাহ্নভোজসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবার। আন্তরিক আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়ে অতিথিরা আয়োজকদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। খাবারের টেবিলেও চলতে থাকে প্রাণখোলা আলাপচারিতা, হাস্যরস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা।
আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এমন আয়োজন পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে, সামাজিক বন্ধনকে সুসংহত করে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যতেও এমন মিলনমেলার ধারাবাহিক আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বিদায়ের সময় সবার চোখেমুখে ছিল আনন্দের ঝলক, আবারও একত্রিত হওয়ার প্রত্যয় এবং হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা।
দিনব্যাপী এই আয়োজন শুধু একটি মিলনমেলা নয়; এটি ছিল বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, সম্প্রীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে একসঙ্গে পথচলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইতিহাসের সাক্ষী গোবিন্দ ধামের আঙিনায় কাটানো এই দিনটি অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতির পাতায় দীর্ঘদিন উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।