কুমিল্লায় নিহতদের স্মরণে ‘একুশে শারদ’, নানুয়াদিঘীর পাড়ে জ্বলে উঠল শ্রদ্ধার প্রদীপ
তাপস চন্দ্র সরকার।।
কুমিল্লায় ২০২১ সালের শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে আয়োজন করা হয়েছে ‘একুশে শারদ’। নিহতদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে প্রদীপ প্রজ্বালন ও শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে এ স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করে সংগঠন ‘ত্রিশূল’।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় কুমিল্লা নগরীর নানুয়াদিঘীর পাড়ে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে সহিংসতায় নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দসহ সনাতন ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক শ্রী শ্যামল কৃষ্ণ সাহা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ চন্দ্র সরকার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা মহানগর শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অচিন্ত দাশ টিটু এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতা কমল চন্দ খোকন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন ত্রিশূলের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য ড. বিশ্বজিৎ দেব ও অ্যাডভোকেট স্বর্ণকমল নন্দী পলাশ, সংগঠনটির কর্ণধার আশীষ কুমার দাস, সাধারণ সম্পাদক অনন্য ভৌমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
২০২১ সালের শারদীয় দুর্গাপূজার অষ্টমীতে কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, হামলা, ভাঙচুর ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনা দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর শোক, উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
সেই বেদনাবিধুর অধ্যায়ে নিহতদের স্মরণে আয়োজিত ‘একুশে শারদ’ ছিল হারানো প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং শোকাহত পরিবারগুলোর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশের একটি প্রয়াস। প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে নিহতদের স্মৃতি ধারণের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বার্তাও তুলে ধরা হয়।
আয়োজকদের মতে, প্রতিটি প্রদীপ কেবল স্মৃতির প্রতীক নয়; বরং তা ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের বহুধর্মীয় সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতা সমাজের ঐক্য, পারস্পরিক আস্থা এবং মানবিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন সংশ্লিষ্টরা।
আয়োজক কমিটির নেতৃবৃন্দ সনাতনী সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এ স্মরণানুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, অতীতের বেদনাদায়ক ঘটনাগুলো স্মরণ করার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে এমন সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সম্মিলিত সচেতনতা আরও জোরদার করা সম্ভব।
তাঁদের প্রত্যাশা, ‘একুশে শারদ’ শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে বিভেদের পরিবর্তে সম্প্রীতি, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার এবং বিদ্বেষের পরিবর্তে মানবিকতার চর্চাকে এগিয়ে নেবে।
নানুয়াদিঘীর পাড়ে জ্বলে ওঠা শ্রদ্ধার প্রদীপগুলো তাই শুধু অতীতের বেদনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়নি; বরং একটি অসাম্প্রদায়িক, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ও তুলে ধরেছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সহাবস্থান নিশ্চিত করার আহ্বানই হয়ে উঠেছে ‘একুশে শারদ’ স্মরণানুষ্ঠানের মূল বার্তা।