October 20, 2026, 1:57 am
শিরোনাম:
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় মিছমেথুইর কালী ও দুর্গা মন্দিরে ধুমধামে শারদীয় দুর্গোৎসব হাদল বড় বিল সৈকতে আরাফাত রহমান কোকোর সৃতিতে নৌকা বাইজ অনুষ্ঠিত দেওঘরের পাওন সদয়নগরে শারদীয় দুর্গোৎসবে নগদ অর্থ উপহার দিলেন বিএনপি নেতা মুনসুর আলম চৌধুরী দুই বছরের কমিটি, দায়িত্বে তৃতীয় বছরেও—করতকান্দী দুর্গাপূজায় নেতৃত্বে সনজয় সরকার বিজয়নগরে ফেসবুকে অপপ্রচারের অভিযোগে বিল্লাল মেম্বারের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা। সাংবাদিককে হেনস্তা, মানহানিকর প্রচার ও ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি। বরুড়ার মহেশপুর রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনে জেলা ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ চাটমোহরে সন্ধানী যুব সমিতির আওয়ামী লীগপন্থী কমিটি বাতিল ও অনিয়ম তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন। রুড়ার মহেশপুর রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনে জেলা ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ অষ্টগ্রামে পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে কিশোরগঞ্জ -৪ আসনের সাংসদ এডভোকেট ফজলুর রহমান জামালপুরে উৎসব ও সম্প্রীতিতে পালিত হোক দুর্গাপূজা, সোহেল রানা খান

কুমিল্লায় ‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’র শততম পর্ব : সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিকতার এক অনন্য উৎসব

রিপোর্টারের নাম

কুমিল্লায় ‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’র শততম পর্ব : সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিকতার এক অনন্য উৎসব

তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা থেকে।

একটি শহরের পরিচয় শুধু তার স্থাপনা, সড়ক কিংবা ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে থাকে সেই শহরের মানুষ, সংস্কৃতি, শিল্পচর্চা ও সাহিত্যপ্রেমে। যে শহরে নিয়মিত কবিতার উচ্চারণ শোনা যায়, বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দে প্রাণ জেগে ওঠে, সৃজনশীল মানুষ একত্র হয়ে ভাবনার আলো ভাগাভাগি করেন—সেই শহরই হয়ে ওঠে সভ্যতার এক উজ্জ্বল ঠিকানা।

কুমিল্লা এমনই এক শহর। আর সেই সাহিত্যনগরীর হৃদয়ে বহুদিন ধরে নিরলসভাবে জ্বালিয়ে রাখা এক আলোকশিখার নাম ‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’। শত ব্যস্ততার মাঝেও যারা বিশ্বাস করে—শব্দই মানুষকে বদলে দিতে পারে, সাহিত্যই পারে মানুষকে আরও মানবিক করে তুলতে—তাদেরই নিরন্তর প্রয়াসের গৌরবময় মাইলফলক স্পর্শ করল এই আয়োজন।

রবিবার (১২ জুলাই ২০২৬) সন্ধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা কেন্দ্র যেন রূপ নিয়েছিল এক প্রাণবন্ত সাহিত্য-উৎসবে। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল—”শব্দে শব্দে জীবন”। এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়েছিল পুরো আয়োজনের দর্শন। কারণ মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, সংগ্রাম-স্বপ্ন—সবই তো শেষ পর্যন্ত শব্দেই রূপ পায়।

শততম পর্ব উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ স্মারক প্রকাশনা ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। স্মারকটির পাঠ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর চলে এর মূল্যায়ন, স্মৃতিচারণ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা।

মঞ্চে একে একে উঠে আসেন কুমিল্লার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক, কবি, লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিশিষ্টজন। তাঁদের কথায় উঠে আসে একটাই বিশ্বাস—সাহিত্য কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি মানুষের বিবেক গঠনের শক্তি, সমাজ পরিবর্তনের প্রেরণা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে মানবিকতার উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

সচেতন রাজনৈতিক ফোরাম, কুমিল্লার প্রধান সমন্বয়ক ড. শাহ্ মোহাম্মদ সেলিম বলেন, যে সমাজে সাহিত্যচর্চা বেঁচে থাকে, সে সমাজে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিকতা এবং সুস্থ সংস্কৃতি বিকশিত হয়। তিনি জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডাকে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে জাতীয় কবির বিদ্রোহী চেতনা, সাম্য, মানবতা ও প্রেমের দর্শনের সঙ্গে বর্তমান সময়ের সাহিত্যচর্চার সম্পর্ক তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সাহিত্য মানুষকে শুধু শিক্ষিত করে না; সাহসীও করে তোলে।

অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, একটি সাহিত্য আড্ডা কখনো শুধুই আড্ডা নয়; এটি মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়ে তোলার, চিন্তার পরিধি বাড়ানোর এবং সমাজকে সুন্দর করার এক কার্যকর মাধ্যম।

এছাড়াও প্রফেসর জামাল নাসের, এস. এস. খায়রুল আলম খসরু, অধ্যাপক শ্যামা প্রসাদ ভট্টাচার্য, এডভোকেট গোলাম ফারুক, ড. আবুল বাসার, এডভোকেট মো. মাহাবুবুর রহমান, রীতা সরকার, এডভোকেট স্বর্ণ কমল নন্দী পলাশ, পীযুষ কুমার ভট্টাচার্য এবং রীতা চক্রবর্তীসহ অন্যান্য বক্তারা জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডার শততম পর্বকে একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়। এই ধারাবাহিকতার পেছনে রয়েছে নিষ্ঠা, ত্যাগ, ভালোবাসা এবং সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগ।

অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আবেগ, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার এক অনন্য আবহ। প্রবীণ সাহিত্যিকদের অভিজ্ঞতার পাশে জায়গা করে নেয় তরুণদের স্বপ্ন। কবিতার উচ্চারণ, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, শুভেচ্ছা বিনিময় আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে যেন সৃষ্টি হয় এক বর্ণিল মানসিক উৎসব।

এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে যার অক্লান্ত শ্রম, নিষ্ঠা ও স্বপ্ন জড়িয়ে আছে, তিনি জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডার কর্ণধার হালিম আব্দুল্লাহ। তাঁর সুচারু ও প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় পুরো অনুষ্ঠানটি পায় এক স্বতন্ত্র গতি। উপস্থিত বক্তারা তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, সাহিত্যপ্রেম এবং নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

অনুষ্ঠানে কুমিল্লার বিভিন্ন সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, কবি, লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী এবং সুশীল সমাজের অসংখ্য মানুষ অংশ নেন। তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়েও সাহিত্য মানুষের হৃদয়ে তার চিরন্তন আবেদন হারায়নি।

শততম পর্ব ছিল না কেবল একটি সংখ্যা পূরণের আনুষ্ঠানিকতা; এটি ছিল একটি স্বপ্নের শতধাপ অতিক্রমের গল্প। অসংখ্য কবিতা, অগণিত আলোচনা, শত শত মানুষের অনুভূতি আর ভালোবাসায় গড়ে ওঠা এই সাহিত্য আড্ডা আজ কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি অনন্য অধ্যায়।

দিন শেষে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে, আলো নিভেছে, মানুষ ঘরে ফিরেছে। কিন্তু থেকে গেছে কিছু শব্দ, কিছু অনুভূতি, কিছু প্রতিশ্রুতি। কারণ সাহিত্য কখনো শেষ হয় না—একটি কবিতা শেষ হলে আরেকটি কবিতার জন্ম হয়, একটি আড্ডা শেষ হলে শুরু হয় নতুন কোনো স্বপ্নের যাত্রা।

‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’র শততম পর্ব তাই শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল শব্দের প্রতি ভালোবাসার এক দীপ্ত ঘোষণা, সংস্কৃতির প্রতি অঙ্গীকার এবং আগামী দিনের সাহিত্যযাত্রাকে আরও সুদূরপ্রসারী করে তোলার এক প্রেরণাদায়ী অঙ্গীকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page
Developed by: BD IT HOST