অবকাঠামো ৫০ শয্যার, জনবল চলছে ৩১ শয্যার—অষ্টগ্রামে স্বাস্থ্যসেবায় সংকট
চিকিৎসক-নার্সের পদ শূন্য, বাড়ছে রোগীর চাপ ও ভোগান্তি
মোঃ মাহবুব আলম, (অষ্টগ্রাম) কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি :
কিশোরগঞ্জের আড়াই লক্ষাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল ‘অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’। হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে হাসপাতালটিকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও এখনও চলছে ৩১ শয্যার জনবল দিয়েই। তবে হাসপাতালে প্রতিদিন রোগী বাড়লেও সরকারি বরাদ্দ বাড়ছে না। বর্তমানে রোগীর চাপ বাড়ায় বরাদ্দ অপ্রতুল বলে মনে করছেন স্থানীয় সেবা প্রার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমানে চিকিৎসকের মোট পদের ৬৬ শতাংশই শূন্য। অনুমোদিত ৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন চিকিৎসক। চিকিৎসকদের ১১টি কনসালটেন্ট পদের সবকটি এবং ১টি আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদ শতভাগ শূন্য অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ১৯টি মেডিকেল অফিসার বা সহকারী সার্জন পদের মধ্যে ৭টি শূন্য এবং ১ জন অননুমোদিত অনুপস্থিত রয়েছেন।
চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি ও পদায়নের পর না থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তীব্র আবাসন সংকটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবাসন সুবিধার অভাব এবং দুর্গম হাওর এলাকার চ্যালেঞ্জিং পরিবেশের কারণে পদায়ন পেলেও চিকিৎসকরা দীর্ঘদিন এখানে অবস্থান করতে চান না।
এর ফলে হাসপাতালটিতে পূর্বে সিজারিয়ান ব্যবস্থা চালু করা হলেও দক্ষ সার্জনের অভাবে তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অথচ এখানে একটি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার (ওটি) থাকা সত্ত্বেও সার্জনের অনুপস্থিতিতে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থেকে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো নষ্ট হচ্ছে।
নার্সিং ও সেবিকা ক্ষেত্রেও রয়েছে তীব্র ঘাটতি। ৩০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২১ জন (শূন্য ৩০%)। মিডওয়েফ বা ধাত্রীর ৪টি পদের ৩টিই (৭৫%) ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসক ও মাত্র ১ জন ধাত্রীর অদম্য সাহসী প্রচেষ্টায় মাতৃস্বাস্থ্য সেবায় আশাব্যঞ্জক সাফল্য এসেছে। ২০২৪ সালে হাসপাতালে ৯৩৫টি এবং ২০২৫ সালে ৮০৫টি সফল নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে, যা ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দাঁড়ায় ৫৪৮টিতে। তবে মধ্যরাতে কোনো জটিলতা দেখা দিলে বা সিজারিয়ান সেবার প্রয়োজন হলে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে রোগীকে টারশিয়ারি হাসপাতালে পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
অন্তর্বিভাগে মাত্র ১৩ জন নার্স দিয়ে তিন শিফটে সেবা চালু রাখায় নার্সদের কোনো সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না এবং জরুরি বিভাগে ৬ জন পুরুষ নার্সকে টানা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
অন্যান্য জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রে ৯১ শতাংশ পদই ফাঁকা। কার্ডিওগ্রাফার (ইসিজি), অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার, জুনিয়র মেকানিক, আয়া, বাবুর্চি, মালি, ওয়ার্ড বয়, ফার্মাসিস্ট এবং এক্স-রে টেকনিশিয়ান—এসব পদের কোনোটিতেই কোনো স্থায়ী কর্মী নেই (১০০% শূন্য)।
বর্তমানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও অফিস সহায়কের ঘাটতি মেটাতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মাত্র ৭ জন আউটসোর্সিং কর্মী এবং ডাক্তার-নার্সদের সমন্বয়ে জরুরি বিভাগ, ইসিজি, প্যাথলজি ও বহির্বিভাগের সেবা চালু রাখা হয়েছে।
এত সীমাবদ্ধতার পরও হাসপাতালে রোগীদের ভিড় আশানুরূপভাবে বেড়েছে। বহির্বিভাগে ২০১৭ সালে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ছিল ৪৮,৫৩৪ জন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১,২৪,০৩৭ জনে এবং ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তা ১,০৪, ৪০৬ জন অতিক্রম করেছে।
জরুরি বিভাগেও ২০১৭ সালের ৫,৮৩০ জন রোগীর তুলনায় ২০২৫ সালে সেবা নিয়েছেন ১৩,২২৬ জন (২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১২,৪৭৩ জন)। ৫ জন পুরুষ, মহিলা, লেবার, শিশু ও কেবিন সহ প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের অধিক রোগী ভর্তি থাকায় ২০২৩ সাল থেকে শয্যা পূর্ণতার হার (বেড অকুপেন্সি রেট) ১০০% এর উপরে অবস্থান করছে, যা ২০২৫ সালেও ছিল ১০৪.৪২%।
প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক স্বচ্ছতা ও সেবার মান বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয় ও বাজেট বরাদ্দেও। ২০২২ সালে স্বাস্থ্যসেবা খাত থেকে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ইউজার ফি-র পরিমাণ ছিল ২,২৫,৩৯৪ টাকা, যা ২০২৫ সালে ৫ গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ১২,৭০,৮৮৯ টাকায় (মাসিক গড়ে প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা) এবং ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত জমা হয়েছে ১০,৮৫,৫৬৫ টাকা। পাশাপাশি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ওষুধ বাজেট ছিল ৭৮,০৩,৫৩০ টাকা, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১,০৭,৪৪,২৩০ টাকা এবং চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১,১৯,৩৭,৯৪০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়া রোগীদের চাহিদার তুলনায় এ বাজেট বরাদ্দ এখনও বেশ সীমিত।
অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ বলেন, “রোগীর চাপ অনুযায়ী বাজেটের স্বল্পতা, চিকিৎসকদের আবাসন সমস্যা ও জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও জানানো হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, “মূলত চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য খাতের জনবল নিয়োগের বিষয়টি সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত অবহিত করে আসছি। তাছাড়া হাওরাঞ্চলে আবাসন সংকটসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে চিকিৎসকরা পদায়ন পেলেও দীর্ঘদিন সেখানে অবস্থান করতে চান না, যা একটি বড় সমস্যা।”
তিনি আরও বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদগুলো এখন মূলত আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। সেখানে বর্তমানে কতজন আউটসোর্সিং কর্মী কর্মরত আছেন তা খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হবে।