October 19, 2026, 9:22 am
শিরোনাম:
দেওঘরের পাওন সদয়নগরে শারদীয় দুর্গোৎসবে নগদ অর্থ উপহার দিলেন বিএনপি নেতা মুনসুর আলম চৌধুরী দুই বছরের কমিটি, দায়িত্বে তৃতীয় বছরেও—করতকান্দী দুর্গাপূজায় নেতৃত্বে সনজয় সরকার বিজয়নগরে ফেসবুকে অপপ্রচারের অভিযোগে বিল্লাল মেম্বারের বিরুদ্ধে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা। সাংবাদিককে হেনস্তা, মানহানিকর প্রচার ও ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি। বরুড়ার মহেশপুর রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনে জেলা ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ চাটমোহরে সন্ধানী যুব সমিতির আওয়ামী লীগপন্থী কমিটি বাতিল ও অনিয়ম তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন। রুড়ার মহেশপুর রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনে জেলা ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ অষ্টগ্রামে পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে কিশোরগঞ্জ -৪ আসনের সাংসদ এডভোকেট ফজলুর রহমান জামালপুরে উৎসব ও সম্প্রীতিতে পালিত হোক দুর্গাপূজা, সোহেল রানা খান সিরাজগঞ্জে ৫৫১ পূজামণ্ডপে জেলা পরিষদের অনুদানের চেক বিতরণ কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলায় পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ

কুমিল্লায় উল্টো রথযাত্রা মহোৎসবে লাখো ভক্তের ঢল

রিপোর্টারের নাম

কুমিল্লায় উল্টো রথযাত্রা মহোৎসবে লাখো ভক্তের ঢল

“জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে মুখর নগরী, সম্প্রীতি ও বিশ্বশান্তির বার্তায় শেষ হলো নয় দিনের মহোৎসব

তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা।

“জয় জগন্নাথ… জয় জগন্নাথ…”—হাজারো কণ্ঠের একযোগে উচ্চারিত এই ধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঘণ্টা-করতাল ও মহাহরিনাম সংকীর্তনের সুরে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মুখর হয়ে ওঠে কুমিল্লা নগরী। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ভক্তি, আনন্দ আর সর্বজনীন সম্প্রীতির অপূর্ব মিলনে লাখো ভক্তের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় শ্রী শ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবীর পবিত্র উল্টো রথযাত্রা মহোৎসব। এর মধ্য দিয়েই সমাপ্তি ঘটে নয় দিনব্যাপী রথযাত্রা মহোৎসবের।

দুপুরের পর থেকেই নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের ঢল নামে। ফুল, আলোকসজ্জা ও বর্ণিল সাজে সজ্জিত মন্দির এবং সুদৃশ্য রথ যেন এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করে। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষ ভক্তিভরে অংশ নেন এই মহোৎসবে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি উৎসবটি পরিণত হয় সৌহার্দ্য, মানবতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায়।

কুমিল্লার জগন্নাথপুর শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির এবং ঠাকুরপাড়াস্থ শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ গৌর-নিতাই মন্দিরভিত্তিক আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), কুমিল্লার যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজার্চনা, অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, মহাহরিনাম সংকীর্তন, ধর্মসভা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও মহাপ্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে এ মহোৎসব পালিত হয়।

আয়োজক সূত্রে জানা যায়, উল্টো রথযাত্রা উপলক্ষে নগরীর শ্রী শ্রী গুন্ডিচা মন্দিরে সকাল সাড়ে ৭টা থেকেই শুরু হয় পূজার্চনা, দর্শন-আরতি, বিশ্বশান্তি কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, ভজন-কীর্তন এবং মহাপ্রসাদ বিতরণ। কুমিল্লাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী এতে অংশ নেন। অনেকেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে জগন্নাথদেবের দর্শন গ্রহণ করেন এবং মহাপ্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের ধন্য মনে করেন।

দুপুরে অনুষ্ঠিত ধর্মসভায় ধর্মীয় গুরু, বিশিষ্টজন, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আশীর্বাদক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি শ্রী শ্রীমৎ ভক্তি অদ্বৈত নবদ্বীপ স্বামী মহারাজ। উদ্বোধন করেন ইসকনের সাধারণ সম্পাদক শ্রী শ্রীমৎ ভক্তিময় নিতাই স্বামী মহারাজ।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুমিল্লা সদর আসনের সংসদ সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসূফ মোল্লা টিপু, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উৎবাতুল বারী আবু, জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া, কুমিল্লা (দক্ষিণ) জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম প্রমুখ।

ধর্মসভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন জগন্নাথপুর শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির ইসকন কুমিল্লার সহ-সভাপতি শ্রীমান ভদ্র নিমাই দাস ব্রহ্মচারী।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন- বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক শ্রী শ্যামলকৃষ্ণ সাহা। স্বাগত বক্তব্য দেন- মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক শ্রীমান রূপচন্দ্র শ্যাম দাস ব্রহ্মচারী। উদ্বোধনী শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করেন শ্রীমান সদা শিব সিংহ দাস ব্রহ্মচারী এবং সভাপতিত্ব করেন শ্রীমান সুদর্শন জগন্নাথ দাস ব্রহ্মচারী।

ধর্মসভা শেষে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত উল্টো রথযাত্রা। কীর্তনের তালে তালে হাজারো ভক্ত রথের রশি ধরেন। “হরে কৃষ্ণ, হরে রাম” এবং “জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে কুমিল্লার প্রধান সড়ক। করতাল, মৃদঙ্গ ও শঙ্খধ্বনির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে সুসজ্জিত রথ। দুই পাশে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ এ দৃশ্য উপভোগ করেন। অনেকে মোবাইল ফোনে স্মরণীয় মুহূর্ত ধারণ করেন, আবার কেউ কেউ ভক্তিভরে রথকে প্রণাম জানান।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, রথের রশি স্পর্শ করা কিংবা রথ টানার সুযোগ পাওয়া পরম সৌভাগ্যের বিষয়। তাই নারী-পুরুষ, শিশু, যুবক ও প্রবীণ—সবাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে রথ টেনে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করেন। অনেকের চোখেমুখে ফুটে ওঠে আবেগ, আনন্দ ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির অনন্য প্রকাশ।

শোভাযাত্রায় বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা, মহানগর ও আদর্শ সদর উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবটিকে এক সর্বজনীন সম্প্রীতির বন্ধনে রূপ দেয়।

উল্টো রথযাত্রার ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে বক্তারা বলেন, রথযাত্রার সময় শ্রী শ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবী মূল মন্দির থেকে গুন্ডিচা মন্দিরে গমন করেন। নির্ধারিত সময় শেষে উল্টো রথযাত্রার মাধ্যমে পুনরায় নিজ মন্দিরে প্রত্যাবর্তন করেন। এই প্রত্যাবর্তনই উল্টো রথযাত্রা হিসেবে উদযাপিত হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এই মহোৎসবে অংশগ্রহণ করলে ঈশ্বরের বিশেষ কৃপা লাভ হয় এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তি, কল্যাণ ও সৌভাগ্য বয়ে আসে।

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), কুমিল্লার সভাপতি শ্রী সুকান্ত চক্রবর্তী (সুদর্শন জগন্নাথ দাস ব্রহ্মচারী) বলেন, “শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ভক্তি, সম্প্রীতি, মানবকল্যাণ ও বিশ্বশান্তির এক অনন্য বার্তা বহন করে। সকলের অংশগ্রহণেই এই মহোৎসব আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।”

তিনি আরও বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের পারস্পরিক অংশগ্রহণই সম্প্রীতির বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম শক্তি। রথযাত্রার মতো ধর্মীয় উৎসব সমাজে সহনশীলতা, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করে। তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব সফল করতে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিবর্গ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মী, স্বেচ্ছাসেবক এবং সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।

আয়োজকরা জানান, ভক্তদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। ফলে পুরো মহোৎসব শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়।

নয় দিনব্যাপী এই রথযাত্রা মহোৎসবজুড়ে পূজার্চনা, ধর্মসভা, মহাহরিনাম সংকীর্তন, ভজন-কীর্তন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মহাপ্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে ভক্তদের মাঝে ধর্মীয় চেতনা, মানবসেবা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও বিশ্বশান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

দিনশেষে যখন জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবীর রথ পুনরায় নিজ মন্দিরে ফিরে আসে, তখন ভক্তদের কণ্ঠে আবারও ধ্বনিত হয়—”জয় জগন্নাথ”। প্রার্থনায় মুখরিত হয় চারদিক। হাজারো ভক্তের বিশ্বাস, এই পবিত্র প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়েই নতুন আশীর্বাদ, নতুন আশা এবং মানবকল্যাণের এক চিরন্তন বার্তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের সর্বস্তরে। কুমিল্লার এবারের উল্টো রথযাত্রা মহোৎসব তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছে ভক্তি, ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের এক অবিস্মরণীয় মহামিলনমেলায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Our Like Page
Developed by: BD IT HOST