সংকটে ধুঁকছে দোহারের প্রাচীনতম জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার
১৯৩৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দীর্ঘ ৮৯ বছর পার করেছে ঢাকার দোহার উপজেলার ৮ নং জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার আলো ছড়ানোর দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ধুঁকছে জীর্ণ ভবন, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীর অভাবে, বর্তমানে নেই বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটি। এক সময়ের মুখরিত এই বিদ্যাপীঠটি এখন যেন অবহেলা আর দুরবস্থার প্রতিচ্ছবি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন ১ এর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ২০০১ সালে নির্মিত ভবনটির দুটি কক্ষের প্লাস্টার খসে পড়ছে। কক্ষের সামনের অংশে ভেন্টিলেটার অর্ধেক থাকলেও আর অর্ধেক নেই, ছাদের কনক্রিট উঠে গিয়ে মরিচা ধরা রড বেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। কাঠের দরজাগুলোতে ধরেছে ঘুণ, যা যে-কোনো সময় ভেঙে পড়ার অপেক্ষায়। পুরোনো ভবনের দুটি কক্ষ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় ২০১০ সালে পুনঃনির্মিত ভবন ২ এর মাত্র দুটি কক্ষে চলছে শ্রেণির পাঠদান। ভবন -১ ঝুকিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কক্ষ স্বল্পতার কারণে, একটি কক্ষে জীবনের ঝুকি নিয়ে শিক্ষকগণ অফিসিয়াল কার্যক্রম পরিচালনা এবং আরেকটি কক্ষে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষিকা রওশনারা বেগম জানান, বর্তমানে বিদ্যালয়ে মোট ১২৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এরমধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ১৮ জন, প্রথম শ্রেণি ১১ জন, দ্বিতীয় শ্রেণি ২৩ জন, তৃতীয় শ্রেণি ২৫ জন, চতুর্থ শ্রেণি ৩৩ জন, পঞ্চম শ্রেণি ১৪ জন।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, স্থানীয় অভিভাবকরা এখন সরকারি এই জীর্ণ বিদ্যাপীঠের চেয়ে বেসরকারি বা কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। এছাড়া বিদ্যালয়ে আসার যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল দশা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতিতে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিদ্যালয়টি একসময় এমন ছিল না। ছাত্র-ছাত্রীদের কোলাহলে সব সময় থাকতো মুখরিত। ২০১০ সালেও এখান থেকে ২ জন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছিল। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়া এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে বিদ্যালয়টি তার পুরোনো ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক ও কক্ষের অভাবে পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের এখানে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা লিপন খান জানান, ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত একটি বহুতল নতুন এবং আধুনিক ভবন নির্মাণ প্রয়োজন। অন্য আর এক বাসিন্দা মোহাম্মদ জামাল-এর মতে, একটি বহুতল নতুন এবং আধুনিক ভবন নির্মাণসহ বিদ্যালয়ে যাতায়াতের রাস্তা মেরামত করা প্রয়োজন, তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও আশঙ্কাজনক হারে কমে যেতে পারে। বিদ্যালয়টির দেখভালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ বর্তমানে শেষ হয়ে গেছে। তবে প্রধান শিক্ষিকা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অতি শীঘ্রই নতুন ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হবে, যা বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সহায়ক হবে।
দোহার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করা হলে মো: নায়েব আলী উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, দোহার, ঢাকা, (যিনি কার্তিকপুর ক্লাস্টারের দায়িত্বে আছেন) জানান, তিনি গত ২ মে, ২০২৬ এ জামালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখেন, বিদ্যালয়ের ভবন -১ জরাজীর্ণ ও ব্যবহার অযোগ্য। ভবন-২ এর দুইটি কক্ষে পাঠদান কার্যক্রম চলমান আছে।
তিনি আরও যোগ করেন যে, নতুন ভবন নির্মাণ করা অতি প্রয়োজন, যা অনলাইন পরিদর্শনে উল্লেখ করা হয়েছে। দোহার উপজেলায় নিয়োজিত শিক্ষা প্রকৌশলীকে নতুন ভবনের জন্য ডকুমেন্ট পাঠানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তিনি কামনা করছেন। তিনি আরও জানান, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সত্য, তবে ৪ সদস্য বিশিষ্ট এডহক কমিটি রয়েছে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি অতিশীঘ্র তা গঠন করা হবে।
এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন, যেন দ্রুত এই জীর্ণ ভবনটি সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে পাঠদানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়।