রৌমারীর ৮ আশ্রয়ণ কেন্দ্র: সংস্কার নাকি স্রেফ আশ্বাস?
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার এবং প্রতি বছর বন্যার সাথে লড়াই করা কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে নদী ভাঙন আর প্লাবনের আতঙ্ক, অন্যদিকে দুর্গতদের আশ্রয়ের জন্য নির্মিত কেন্দ্রগুলোর কঙ্কালসার দশা। ইফাদ (IFAD)-এর অর্থায়নে এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED)-এর বাস্তবায়নে নির্মিত রৌমারীর সেই বহুল আলোচিত বন্যা আশ্রয়ণ কেন্দ্রগুলো এখন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্রেফ ‘ধ্বংসস্তূপে’ পরিণত হতে চলেছে। উন্নয়ন যখন হরিলুট আর অবহেলার শিকার পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প-২১ এর আওতায় দাঁতভাঙ্গা-রাজিবপুর ভায়া রৌমারী সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মোট আটটি আশ্রয়ণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছিল। জন্দির কান্দা থেকে শুরু করে মির্জাপাড়া, কাঁঠালবাড়ি, চাক্তাবাড়ী হয়ে সায়দাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রকল্পটির ব্যয় ছিল ১০ কোটি ৭১ লক্ষ ৩৬০ হাজার টাকা। ২০০৪ সালে সমাপ্ত হওয়া এই কেন্দ্রগুলো হওয়ার কথা ছিল চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের নিরাপদ ঠিকানা। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে যে চিত্র দেখা গেল, তাকে ‘হরিলুট’ ছাড়া আর কিছু বলা কঠিন। চুরি ও ভাঙচুর: কোনো কেন্দ্রের শৌচাগার ব্যবহারের অনুপযোগী, কোথাও দরজা উধাও। এমনকি মাথার ওপরের টিনগুলো পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে। অবৈধ দখল: স্থানীয় প্রভাবশালী ও সুযোগসন্ধানীরা কোথাও ইটের দেয়াল ভেঙে ফেলছে, আবার কোথাও আশ্রয় কেন্দ্রের টিন দিয়ে ঘিরে নিজেদের ব্যক্তিগত বসতভিটা বা দোকান নির্মাণ করছে। কর্তৃপক্ষের নীরবতা: দীর্ঘ দুই দশকে এই সম্পদগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর নজরদারি দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ ও জনদুর্ভোগের আশঙ্কা
সামনেই বর্ষার মৌসুম। ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়ার সাথে সাথে যখন হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু জায়গার খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরবে, তখন এই পরিত্যক্ত প্রায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলো তাদের কতটা ভার সইতে পারবে, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। বিশিষ্ট সমাজসেবক ও সংগঠক শাহ মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "সঠিক তদারকির অভাবেই আজ এই জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ধ্বংস হচ্ছে। এখনই সংস্কার না করলে আসছে বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাবে।" একই সুরে কথা বলেছেন সমাজসেবক মোঃ নাজমুল চৌধুরী নয়া। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "এগুলো জনগণের সম্পদ। জনগণের জানমাল রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা না নিলে আসন্ন বন্যায় সাধারণ মানুষের বিপদে পড়ার আর কোনো সীমা থাকবে না।" আশ্বাসের বাস্তবায়ন কতদূর? রৌমারী-রাজিবপুর ও চিলমারী নিয়ে গঠিত ২৮-কুড়িগ্রাম-৪ আসনের সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি জনাব মাহবুবুর আলম অবশ্য আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আছে এবং বন্যার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশ্বাস নয়, রৌমারীবাসী এখন দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়। যখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে একটি অবকাঠামো তৈরি করা হয়, তখন তার রক্ষণাবেক্ষণ কেন হবে না? জনস্বার্থে নির্মিত এই কেন্দ্রগুলো কি এভাবেই চোর আর দখলদারদের গ্রাসে হারিয়ে যাবে? আসন্ন বর্ষার আগেই জন্দির কান্দা থেকে সায়দাবাদ পর্যন্ত এই আটটি আশ্রয়ণ কেন্দ্র সংস্কার করে ব্যবহারের উপযোগী করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বন্যায় যেকোনো মানবিক বিপর্যয়ের জন্য প্রশাসনের উদাসীনতাই দায়ী থাকবে।
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
মোবাইলঃ01740453802