বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ মতলব উত্তর উপজেলা শাখার বর্ধিত সভা ও ১৩নং ইসলামাবাদ ইউনিয়নের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত
"ধর্ম যার যার—উৎসব সবার, ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়—ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই" স্লোগানে সম্প্রীতি, অধিকার ও সংগঠনকে শক্তিশালী করার প্রত্যয়
তাপস চন্দ্র সরকার।।
"ধর্ম যার যার—উৎসব সবার, ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়—ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র চাই"—এই প্রত্যয়দীপ্ত স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ মতলব উত্তর উপজেলা শাখার উদ্যোগে বর্ধিত সভা ও ১৩নং ইসলামাবাদ ইউনিয়ন শাখার দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রীতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিকাশ, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার সংরক্ষণ এবং তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকারে মুখর ছিল পুরো আয়োজন।
শনিবার (২৫ জুলাই ২০২৬) চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার তিতারকান্দি কালী মায়ের বাড়ি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এ সভা ও সম্মেলনে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি, সুধীজন এবং স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। দিনব্যাপী এ আয়োজনে সম্প্রীতি, ঐক্য ও পারস্পরিক সহমর্মিতার এক অনন্য পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ চাঁদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বিনয় ভূষণ মজুমদার। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জেলা শাখার সদস্য সচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা অজিত কুমার সাহা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ চাঁদপুর জেলা শাখার সদস্য উৎপল মজুমদার আশীষ, ১৩নং ইসলামাবাদ ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের প্রাক্তন ইউপি সদস্য অমৃতলাল নাগ, মতলব উত্তর উপজেলা শাখার সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা নির্মল চন্দ্র সরকার, তিতারকান্দি শ্রীশ্রী রক্ষা কালী মন্দির কমিটির সভাপতি ভক্ত প্রধান, ১নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আতাউর রহমান তবিব এবং ২নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য রনজিৎ প্রধান।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন ১৩নং ইসলামাবাদ ইউনিয়ন কমিটির নেতা যোগেশ ঘোষ, শ্রীমঙ্গল হালদার ও শ্রী রামকৃষ্ণ সরকার। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ মতলব উত্তর উপজেলা শাখার সদস্য সচিব সুখ রঞ্জন বিশ্বাস। সভাপতিত্ব করেন উপজেলা শাখার আহ্বায়ক স্বপন কুমার সূত্রধর।
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। সেই চেতনাকে ধারণ করেই সব ধর্মের মানুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁরা বলেন, ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করার জন্য নয়; বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও শান্তির শিক্ষা দেয়। তাই একটি বৈষম্যহীন, সম্প্রীতিময় এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
প্রধান অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বিনয় ভূষণ মজুমদার বলেন, "বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা করা শুধু একটি সংগঠনের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।"
প্রধান বক্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা অজিত কুমার সাহা বলেন, "বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ দীর্ঘদিন ধরে দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে হলে প্রতিটি ইউনিয়নে কার্যকর কমিটি গঠন এবং নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই।"
অন্যান্য বক্তারাও বলেন, সমাজে সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা অপরিহার্য। তাঁরা ধর্মীয় বিদ্বেষ, সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে সকল ধর্মের মানুষের সম্মিলিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে সর্বসম্মতিক্রমে ৪১ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, ১৩নং ইসলামাবাদ ইউনিয়ন শাখার নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এতে নিমাই চন্দ্র দাস সভাপতি, রনজিৎ প্রধান সাধারণ সম্পাদক এবং শ্রীমঙ্গল হাওলাদার সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।
নবনির্বাচিত নেতৃবৃন্দ সংগঠনের আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে নিষ্ঠা, সততা ও ঐক্যের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তাঁরা বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা হবে।
শেষে দেশ, জাতি, সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের শান্তি, সম্প্রীতি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি কামনা করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সম্প্রীতির এই আয়োজন উপস্থিত সবার মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেয় এবং একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় আরও দৃঢ় করে তোলে।