প্রশাসনের নাকের ডগায় মাদকের অভয়ারণ্য: রৌমারীর সেই পরিত্যক্ত ভবন ও জননিরাপত্তা ঝুঁকি
কে,এম,জাকির
রৌমারী(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি
রৌমারী উপজেলা প্রেসক্লাবের ঠিক উত্তর-পশ্চিম পাশেই দাঁড়িয়ে আছে দুটি সরকারি ভবন—একটি একতলা, অন্যটি দোতলা। ৯০-এর দশকে যে ভবন দুটি ছিল কৃষকদের সার বিতরণের প্রাণকেন্দ্র, আজ তা শুধুই কঙ্কালসার এক ধ্বংসস্তূপ। দীর্ঘদিনের অযত্ন আর অবহেলায় ভবন দুটি এখন রূপ নিয়েছে মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানায় এবং অপরাধের এক ভুতুড়ে কেন্দ্রে। সোনালী অতীতের বিবর্ণ বর্তমান স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব মোঃ মতলেব হোসেন ও মোঃ আজহার আলীর স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, এক সময় এই ভবনগুলো থেকে উপজেলার কৃষকদের কৃষি সহায়তা প্রদান করা হতো। কিন্তু আজ সেই চত্বরে কৃষকের পদচারণার বদলে রাজত্ব করছে মাদকসেবীরা। ভবনের ভেতরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় শিউরে ওঠার মতো দৃশ্য। দেয়ালের ইট খসে পড়ছে, ছাদের রড খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ঘরের মেঝেতে গোল করে বসানো ইটের স্তূপ স্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এখানে নিয়মিত বসে মাদকের আসর। শিল্প ও শঙ্কার দোলাচল মজার বিষয় হলো, এই ভুতুড়ে পরিবেশটি স্থানীয় সৃজনশীল মানুষের কাছে আবার ভিন্ন এক আকর্ষণের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৬ সালে নাট্যকার মোঃ জাকির হোসাইনের সম্পাদনা ও মোহাম্মদ রুবেল হোসাইনের প্রযোজনায় এখানে 'উজানী বনাম ভাটিয়া' নাটকের শুটিং হয়েছিল। সম্প্রতি স্থানীয় এস কে সুজনের সম্পাদনায় 'সুলতান' নামক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুটিংও সম্পন্ন হয়েছে এই আঙিনায়। এছাড়া স্থানীয় টিকটকার ও ইউটিউবাররা প্রায়ই এখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফটোসেশন বা ভিডিও ধারণ করতে আসেন। কিন্তু এই শৈল্পিক চর্চার আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা। যেকোনো সময় ভবন ধসে ঘটে যেতে পারে অপমৃত্যুর মতো ঘটনা। নাগরিক উদ্বেগ ও প্রতিকার রৌমারীর বিশিষ্ট সমাজসেবক ও সংগঠক শাহ মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "এটি এখন আর শুধু পরিত্যক্ত ভবন নয়, এটি একটি মরণফাঁদ। দ্রুত এটি সিলগালা করা এবং সরকারি প্রক্রিয়ায় অকশনে দিয়ে ভেঙে ফেলা এখন সময়ের দাবি।" উপজেলা প্রশাসনের একেবারে কাছে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে দিনের পর দিন এখানে মাদক কেনাবেচা ও সেবন চলছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা একটি সরকারি সম্পদ এভাবে অপরাধীদের আস্তানা হতে পারে না। একদিকে ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা যেকোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, অন্যদিকে মাদকের এই আখড়া এলাকার যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জনস্বার্থে এবং নিরাপত্তার খাতিরে রৌমারী উপজেলা প্রশাসনের উচিত অতি দ্রুত ভবন দুটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে নিলামের মাধ্যমে অপসারণের ব্যবস্থা করা। একই সাথে পুলিশি টহল জোরদার করে এলাকাটিকে মাদকমুক্ত করা জরুরি।
আমরা কি তবে কোনো বড় দুর্ঘটনার পরই কেবল সজাগ হবো? নাকি এখনই ব্যবস্থা নিয়ে রৌমারীবাসীকে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়া হবে? উত্তরটি সময়ের হাতে নয়, প্রশাসনের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।