ঘরে বসে বেতন শিক্ষকদের, ক্লাসে অষ্টম শ্রেণিপাস বর্গা শিক্ষক—দুর্গম স্কুলে শিক্ষার বেহাল দশা
(বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি) (শাহাদাত হোসেন বাপ্পি)
বান্দরবান পার্বত্য জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলা আলীকদমের কুরুকপাতা ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে কার্যত ভেঙে পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। এতে করে পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মৌলিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে পরিদর্শনে জানা যায়, উপজেলার ৪ নং কুরুক পাতা ইউনিয়নের কমচঙ ইয়াংছু মারুম পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাংলাই দাংলি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং খিদু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান হয় না। অধিকাংশ সময়ই শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, সংবাদকর্মীদের আগমনের খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট একটি বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক একদিন পর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলেও অন্য দুই স্কুলের শিক্ষকরা যাননি। একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকার প্রতিনিধিরা তিনটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে শিক্ষক অনুপস্থিতির একই ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, এসব বিদ্যালয়ে আগে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-এর আওতায় নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা বর্তমানে দায়িত্ব পালন করলেও অনেকেই নিয়মিত স্কুলে যান না। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তারা বেতন-ভাতা পেয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, সরকার দুর্গম এলাকায় শিক্ষা বিস্তারে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিদ্যালয় নির্মাণ করলেও তদারকির ঘাটতিতে সেই উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে মুরংসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ছে।
মংচিং হ্যাডমেন পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আফসার বলেন, “কিছু শিক্ষকের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে নিয়মিত পাঠদানকারী শিক্ষকদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। আমরা চাই, সকল শিক্ষক দায়িত্বশীলভাবে বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকুন এবং শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখুন।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষক অনুপস্থিতির অভিযোগ পাচ্ছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এর আগে ১৩ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “দুর্গমতার কারণে মনিটরিং কঠিন হলেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনা জোনের সহযোগিতায় এসব বিদ্যালয়কে নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা হবে। শিক্ষকরা দায়িত্বে অবহেলা করলে তাদের বেতন বন্ধসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামসুল আলম বলেন, “যেসব শিক্ষক নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছেন না, তাদের সতর্ক করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বেতন বন্ধসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অতীতে অনিয়ম করে বেতন গ্রহণ করলে তা ফেরত আনার বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য শিক্ষা থেকে আর বঞ্চিত না হয়।