
তাপস চন্দ্র সরকার।।
“হার্ট ডিজিজ ক্যান হাইড ইন প্লেইন সাইট: ডোন্ট মিস এ বিট” —এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারাদেশের ন্যায় কুমিল্লায়ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বিশ্ব হার্ট দিবস-২০২৬। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সকালে কুমিল্লা হার্ট কেয়ার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে দিবসটি উপলক্ষে সচেতনতামূলক আলোচনা ও কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কুমিল্লা হার্ট কেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. তৃপ্তিশ চন্দ্র ঘোষের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী নারী সংগঠন ইনার হুইল বাংলাদেশের সাবেক ডিস্ট্রিক্ট চেয়ারম্যান ও ইনার হুইল ক্লাব অব কুমিল্লার চার্টার প্রেসিডেন্ট ডা. মল্লিকা বিশ্বাস, পিডিজি আব্দুল আউয়াল, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিক্টের সাবেক জেলা গভর্নর এম এ আউয়াল এবং পিডিজি সাবেক ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর এম এ আহাদ। অনুষ্ঠানে চিকিৎসক, আইনজীবী, অধ্যাপক, সাংবাদিক, বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধি ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
র্যালী শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, হৃদরোগের অনেক লক্ষণই প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না। কখনো কখনো বুকের অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, মাথা ঘোরা কিংবা দৈনন্দিন কাজের সময় সামান্য অস্বস্তিকেও মানুষ গুরুত্ব না দেওয়ায় পরবর্তী সময়ে তা জটিল হৃদরোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই হৃদরোগের সম্ভাব্য লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, ধূমপান পরিহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। তারা বলেন, হৃদরোগ শুধু বয়স্ক মানুষের সমস্যা—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ধূমপানসহ বিভিন্ন ঝুঁকির কারণে হৃদরোগের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশ্ব হার্ট দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো—হৃদরোগের লক্ষণ অনেক সময় প্রকাশ্য নয়, তাই কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বক্তারা আরও বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না; ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশে অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর বড় একটি অংশ হৃদরোগ ও সংশ্লিষ্ট জটিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যায়ে নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল, ওজন ও অন্যান্য ঝুঁকি শনাক্ত করার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, “ডোন্ট মিস এ বিট”—হৃদযন্ত্রের কোনো সতর্ক সংকেতকে অবহেলা করা যাবে না। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করা, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও হৃদরোগের ঝুঁকি ও লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে দিনব্যাপী বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতনতামূলক সেমিনার, আলোচনা সভা ও ওয়েবিনারসহ বিভিন্ন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কুমিল্লা হার্ট কেয়ার ফাউন্ডেশনের এ আয়োজনেও হৃদরোগ প্রতিরোধ ও সুস্থ জীবনযাপনের বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আলোচনায় বক্তারা বলেন, হৃদরোগের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে শিশু-কিশোরদের ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা এবং ধূমপান ও অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে দূরে রাখার বিষয়ে সামাজিকভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। তারা আরও বলেন, হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে শুধু চিকিৎসা গ্রহণ করলেই হবে না; নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হৃদরোগ প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ব হার্ট দিবসের এই আয়োজনের মাধ্যমে কুমিল্লায় হৃদরোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সুস্থ জীবনযাপনে মানুষকে উৎসাহিত করার আহ্বান জানানো হয়।