কুমিল্লায় অনিমা-রথীন্দ্র স্মৃতি পাঠাগারের আয়োজনে পাঠচক্র আলোচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্যকর্ম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বিদ্রোহী দর্শন নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছে পাঠচক্র আলোচনা ও কুইজ প্রতিযোগিতা। অনিমা-রথীন্দ্র স্মৃতি পাঠাগারের আয়োজনে এবং গ্লোবাল ইউনিক একাডেমি ও উৎস খেলাঘর, কুমিল্লার সার্বিক সহযোগিতায় এ ব্যতিক্রমী শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শনিবার (৪ জুলাই ২০২৬) সকাল সাড়ে ১১টায় কুমিল্লা নগরীর গর্জনখোলা এলাকায় অবস্থিত গ্লোবাল ইউনিক একাডেমি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাহিত্যপ্রেমী ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল পাঠচক্র আলোচনা, নজরুলের জীবন ও সাহিত্যভিত্তিক উপস্থাপনা, কুইজ প্রতিযোগিতা এবং মুক্ত আলোচনা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অনিমা-রথীন্দ্র স্মৃতি পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও গ্লোবাল ইউনিক একাডেমির অধ্যক্ষ উত্তম বহ্নি সেন। সঞ্চালনা করেন গ্লোবাল ইউনিক একাডেমির প্রভাষক মালবিকা দে।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণপাড়া আবদুল মতিন খসরু মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গৌরাঙ্গ দাস। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সমাজসেবক মো. জাহাঙ্গীর আলম হাজারী, অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার এবং সোনালী ব্যাংক, কুমিল্লা জাঙ্গালীয়া ওয়াদা শাখার প্রিন্সিপাল অফিসার অর্পণ পাল।
অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে বিস্তারিত পাঠ উপস্থাপন করেন গ্লোবাল ইউনিক একাডেমির প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেবোত্তম বহ্নি সেন। তিনি নজরুলের শৈশবের সংগ্রাম, সাহিত্যজীবনের সূচনা, বিদ্রোহী চেতনা, সাম্যবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ এবং বাংলা সাহিত্য-সংগীতে তাঁর অসামান্য অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তাঁর উপস্থাপনায় শিক্ষার্থীরা গভীর আগ্রহ নিয়ে অংশগ্রহণ করে এবং পরবর্তী কুইজ পর্বেও উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেয়।
সভাপতির বক্তব্যে উত্তম বহ্নি সেন বলেন, "একটি সমাজকে আলোকিত করতে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান প্রজন্মকে মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে বের করে বইমুখী করতে নিয়মিত পাঠচক্র, সাহিত্যচর্চা ও জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা প্রয়োজন। কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহের কবি নন, তিনি মানবতা, সাম্য, প্রেম ও অসাম্প্রদায়িকতার কবি। তাঁর আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।"
প্রধান অতিথির বক্তব্যে গৌরাঙ্গ দাস বলেন, "জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর সাহিত্য শুধু কাব্যিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানবমুক্তি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের এক শক্তিশালী ভাষা। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের গণ্ডির বাইরে নজরুলকে জানতে হবে এবং তাঁর আদর্শ নিজেদের জীবনে ধারণ করতে হবে।"
বিশেষ অতিথি মো. জাহাঙ্গীর আলম হাজারী বলেন, "বই পড়ার অভ্যাস মানুষকে আলোকিত করে এবং সুস্থ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"
অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার বলেন, "নজরুল ছিলেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এক অদম্য কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্য আমাদের ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। বর্তমান সময়ে তরুণ সমাজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে নজরুলচর্চার বিকল্প নেই।"
বিশেষ অতিথি অর্পণ পাল বলেন, "একটি পাঠাগার কেবল বইয়ের সংগ্রহশালা নয়, এটি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার অন্যতম কেন্দ্র। নিয়মিত পাঠচক্র ও কুইজ প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।"
আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র কাজী নজরুল ইসলাম সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার ছিলেন। তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতা বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগের সূচনা করে। কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তিনি অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর রচিত প্রায় চার হাজার গান আজ 'নজরুলগীতি' নামে বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, ১৮৯৯ সালের ২৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা নজরুল শৈশব থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করেছেন। মক্তবে শিক্ষকতা, মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন, রুটির দোকানে কাজ এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদান—জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ১৯২২ সালে প্রকাশিত 'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থের 'বিদ্রোহী' কবিতা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের শীর্ষস্থানে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৪২ সালে দুরারোগ্য স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর দীর্ঘদিন নীরব জীবন কাটালেও তাঁর সাহিত্য ও সংগীত আজও কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে নজরুলের জীবন ও সাহিত্যভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়। আয়োজকরা জানান, ভবিষ্যতেও জাতীয় কবি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে ধারাবাহিক পাঠচক্র, আলোচনা সভা ও জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।
এ সময় গ্লোবাল ইউনিক একাডেমির শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, অনিমা-রথীন্দ্র স্মৃতি পাঠাগারের সদস্য, সাহিত্যপ্রেমী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে কুইজ প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান করা হয়।